Thursday, 2 May 2019

অভিমান

প্রথম যখন জিন্স পরি ক্লাস এইটে কি সেভেনে পড়ি। বোন অবশ্য বরাবরই ফ্যান্সি। তিনি তার আগেই জিন্স পরতেন। তা তখন ব্যাপারটা অন্য রকম ছিলো। ক্লাস সিক্স মানে এবার ফ্রক বন্ধ করে চুড়িদারে যাওয়াটাই নিয়ম ছিলো। আমরা দু বোন যথারীতি ক্লাস সিক্সেও বড়ো হয়ে উঠতে পারলাম না। মানে রোগা পাতলা প্যাঁকাটি শরীরে সেই পুঁচকেই লাগি! আম্মুও ফ্রক কেনা বন্ধ করলো না। ওদিকে তখন টিউশনে পাড়ার বন্ধুরা চুড়িদার পড়ছে। তখন মার্কেটে কুচকুচ হোতা হ্যায় হেবি হিট। কাজলের সেই লাল চুনরি সাদা চুড়িদারে মহিলা মহল বিশেষ করে আমাদের মতোন উঠতি ছানাপোনারা বিশালভাবে আকৃষ্ট।
সবাই সাদা চুড়িদারের সাথে লাল ওড়না নিয়ে নিজেদের কাজল ভাবছে। আমিও ভাবার চেষ্টা করলাম.. বাদ সাধলো মাইনাস সিক্সের পেল্লাই চশমা। কালো ফ্রেমের গোলগোল চশমা লোকজনের কাছে হাস্যকর একটা বিষয় ছিলো। পাড়ার ছেলেপুলেরা যখন বাকি কিছুতে পেরে উঠতো না তখন চারচোখো, চশমিস ইত্যাদি বলে খেপাতো। আমিও কেমন জানি তখন এই চশমা পরাটাকে বাজে ভাবে দেখতাম... সবাই কি সুন্দর কাজল, আইলাইনার পরে আর আমার সব ঢেকে যায় ছাই চশমাতেই। বিচ্ছিরি... একেবারে বিচ্ছিরি।
অথচ আমি ছোটো থেকে কি সুন্দর সোজা ভাবে আইলাইনার পরতে পারতাম.. একটুও হাত কাঁপতো না। জুঁই, নিউ সবাই আমার কাছেই আইলাইনার পরতো... আর সেই আমিই কিনা আইলাইনার পরে কাউকে দেখাতে পারছিনা, সব চশমাতে ঢাকা পরে যাচ্ছে!
সবুর স্যারের কাছে বাংলা আর ইংরাজী পড়তে যেতাম। তিনি আবার ধার্মিক মানুষ। সকাল সন্ধে আমাকে চুড়িদার পরার উপদেশ দিতেন.. আর অ্যালান ফ্রক পরা আমি বিরক্ত হয়ে স্যারের ঘরের উঠোনের কলমীশাকে বেশী মনোযোগ দিতাম। স্যার ওদিকে ঘরে পড়াচ্ছেন... এদিকে আমি উঠোনে বর্ষার সজীব লকলকে কলমী শাক, তার গোলাপী ফুল আর মৌমাছি নিয়ে ব্যস্ত।
পড়াশুনো করে কে আর সময় নষ্ট করে!!! যতটুকু দরকার তার বেশী পড়াশোনা করা আমার ধাতে নেই। তাহলে কুকুরছানা, বেড়ালছানা, শালিখ পাখি, পায়রাদের সময় কে দেবে?
যাগগে, যখন জিন্স পরতে শুরু করি ত্রিভুবনে আত্মীয়দের মধ্যে কেউ জিন্স পরেনা। আব্বু মেয়েকে জিন্স পরতে দেখে এক সপ্তাহ কথা বন্ধ করে দিলো... তারপরের সপ্তাহে অবশ্য তাস খেলতে বসে গেছে মেয়েদের সাথে! তখন দশটায় পড়াশোনা শেষ করে আমরা তিনভাইবোন আর আব্বু একঘন্টা তাস খেলতাম। আম্মু চীৎকার করতো “এমন বাপ যে ছেলেদের পড়তে বসতে না বলে তাস খেলতে বলছে”... তারপর একসময় বিরক্ত হয়ে বলতো “ভাত দিচ্ছি.. খেয়ে দেয়ে আমাকে উদ্ধার করো!”
যাগগে, জিন্স পরিহিত মেয়েদের দেখে আনাচে কানাচে ঘুষঘুষে কথা.... ‘কাজী সাহেব বেঁচে নেই তাই মেয়েগুলো এসব অসভ্য জামাকাপড় পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বেঁচে থাকলে ঠান্ডা করে দিতেন এতো সাহস ইত্যাদি প্রভৃ নানারকম বক্তব্য।’
কাজীসাহেব হলেন আমার দাদা... লোকের ধারণা ছিলো উনি বেঁচে থাকলে আমার এতো সাহস হতো না। আমার অবশ্য উল্টো ধারণা... ওনার কারণেই আমি এতো সাহসী। আমিই বোধহয় প্রথম যে ওনার চোখে চোখ রেখে তর্ক করতাম… উনি শেষে যুক্তিতে না পেরে বিরক্ত হয়ে বলতেন বড়ো হয়ে জজ হবি! কিন্তু উনি কখনোই আমাকে বারণ করেননি তর্ক না করতে… কিংবা বলা যায় অতিরিক্ত স্নেহের কারণে আমাকে বাগে আনতে পারেননি। দাদার স্বভাব ছিলো কাউকে ভয় না পাওয়া… আমারও খানিকটা হলেও ঐ স্বভাব আছে।
ওনার ধারণা ছিলো জামাতী-তবলিগের লোকেরা অধিকাংশই ধান্দাবাজ হয়… বেশী ধর্মকর্ম করা লোক উনি পছন্দ করতেন না। একবার আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের পীর হওয়ার গল্প শুনে বলেছিলেন “ও কবে আবার পীর হলো? ওতো কংগ্রেসী গুন্ডা! যত্তসব!”
যাগগে, যা বলছিলাম.. তো মোটামুটি এবার আব্বু আম্মুকে শুনতে হচ্ছে মেয়েকে মানুষ করতে পারোনি। মেয়ে মানে আমি আরকি… যাকে ফরমাশ করলে মুখের উপর বলে নিজে নিয়ে পানি খাও। মুখের সামনে পানি ধরার মতো সময় নেই।
যে সারাদিন বই পড়ে আর কিছু হলেই লেকচার দেয়। অতএব এই রকম একটা ধারণা হলো এতো বেশি বই পড়ার কারণেই অসভ্য মেয়ে হয়েছি।
একবার আমার এক ফুফুমণির বাড়িতে এক বিয়েতে গেছি। বিয়ে শেষে ফিরবো গাড়িতে… তা ফুফুমণির বাড়ি সে চব্বিশ পরগণার দূর এক গ্রামে… বর্ধমান থেকে অনেক দূর, তাই আবার জুনমাসের প্যাচপেচে গরম। অতএব আমরা দুবোনেই জিন্স পরেছি। ফুফুমণির এক আত্মীয় ছিলেন সাংঘাতিক রিগ্রেসিভ… মেয়েদের কি করা উচিত কি করা উচিত নয় তার উপর লেকচার দিচ্ছেলেন। আমিও খুব তর্ক করছি।
শেষে উনি বললেন মেয়ে শিক্ষিত হয়েছে বটে, কিন্তু মানুষ হয় নাই।
ফুফুমণিও বললেন যে আমার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের সামনে নাক কেটে দিলি… এখানে জিন্স পরার কি দরকার ছিলো ইত্যাদি প্রভৃতি।
যতই বোঝানো হোক যে জিন্স তো সারাক্ষণ পরেনি এই বাড়ি যাওয়ার সময় পরেছে রাস্তায় যাতায়াতের সুবিধার জন্য… তিনি মানতেই নারাজ।
আজ অবশ্য ওনার মেয়েও জিন্স পরে… বিদেশে থাকে। অবস্থা মানুষকে অনেকটাই বদলিয়ে দেয় আরকি।
আব্বুকে কতবার কতজন বলেছে মেয়েদের এতটা বাড়তে দেওয়া ঠিক নয়..
একবার আমার আব্বুর এক খালাতো ভাই বলেছিলো মেয়েকে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়িওনা ভাই… ও লাইন খারাপ। ভদ্রলোকের মেয়েদের জন্য না।
যাগগে, আমার আব্বু লোকের কথায় বিশেষ কান দিতো না এই রক্ষে… বরং আম্মু দুদিন মন খারাপ করে বসে থাকে যে লোকে বলছে মেয়ে মানুষ করতে পারিনি ইত্যাদি প্রভৃতি … তারপর আবার উৎফুল্ল হয়ে যায়।
সেই ভদ্রলোকের দুটো মেয়ে… তিনি মেয়েদের ইঞ্জিনীয়ার কিংবা ডাক্তার করবেন ভেবেছেন। ঐ একই কথা অবস্থা মানুষকে বদলিয়ে দেয় কিংবা পরের ছেলে পরমানন্দ, যত উচ্ছন্নে যায় তত আনন্দ!
তা এখন দেখি আত্মীয় স্বজনদের মেয়েরা অনেকেই জিন্স পরে… ভালোই লাগে। সমাজ এগোচ্ছে… আমরা যে প্রতিকূলতা পার হয়েছি সেইটা পরবর্তী প্রজন্ম যেন অনুভব না করে।
অনেকদিন পরে একটা ঢপের লেখা লিখলাম আরকি… হঠাৎ মনে পরে গেলো। অভিমান বেরিয়ে যাওয়া ভালো… ভিতরে রয়ে যাওয়া কাজের কথা না।

পরিচিত মেয়েদের সত্যিকারের গল্প

এই সপ্তাহে পরিচিত কিংবা স্বল্পপরিচিত মেয়েদের সত্যিকারের গল্প লিখবো ঠিক করেছি। প্রথম গল্প খুবই ছোটো। 
মেয়েটি সম্পর্কে আমার মাসি হয়। যদিও আমার থেকে অনেকটাই ছোটো। আমার আম্মুর এক দূর সম্পর্কের মামার মেয়ে। একদিন সম্ভবত কোনো এক রবিবার হবে, কারণ আমি সেদিন বর্ধমানে,বিকেলের দিকে নানাভাই এলেন মেয়ের বিয়ের নেমন্তন্ন করতে। এটা সেটা নানারকমের গল্প চলছে... পাত্রপক্ষ নাকি খুবই ভালো...বংশ ভালো, বড়োলোক, বর্ধমানের বড়োবাজারে দোতলা বাড়ি।একটাই ছেলে..ব্যবসা আছে.. কিছু একটা চাকরিও করে সম্ভবত ...ঠিক মনে পরছে না। আমি যা জিজ্ঞাসা করি সাধারণ তাই করে ফেললাম... “হবু বরের গল্প তো বহু শুনলাম...এবার একটু হবু বউয়ের গল্প শুনি!!!”
নানাভাই হেলে বললেন “এই তো মেয়ের ঊনিশ বছর বয়স.. সেকেন্ড ইয়ারে উঠলো।”
আমি খুবই অবাক হয়ে বললাম “এখনি বিয়ে দেওয়ার কি দরকার ছিলো? গ্রাজুয়েশনটা অন্তত করা উচিত ছিলো।এতো কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বয়স কম থাকলে মেয়েরা শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারিত বেশী হয়... বিয়ে ভাঙার চান্সও বেশী থাকে।”
পাশ থেকে বিব্রত আম্মু বলে উঠলো.. “এইসব কথা বলে এই সময়?”
আমি বললাম “যা সত্যি, সেটাই বলছি। এখনো সময় আছে... পরে কিছু হলে আফসোসের সীমা থাকবে না।”
নানাভাই বললেন “মামণি, সবাই কি তোমার মতো পড়াশোনায় ভালো হয়? আমার মেয়ে বোকা সোকা, শান্ত মানুষ… সাত চড়ে রা কাটে না… তাছাড়া পড়াশোনায় ভালো না। এই বাজারে ঐ পড়াশোনায় চাকরি পাবে না।”
আমি তখন বেশ বিরক্ত... একটু রেগেই বললাম “পড়াশোনায় সবাই ভালো হবে এমনটা নয়... তা বলে আপনি গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট না করেই বিয়ে দিয়ে দেবেন? কিছু ভাবুন না ভাবুন অন্তত পরবর্তী প্রজন্মের কথাটা ভাবুন।
আমিও পড়াশোনায় আহামরি নই, কিন্তু আমার আব্বু আম্মু হতাশ হয়ে চেষ্টা ছেড়ে দেয়নি... তাই আজকে আমি একটা চাকরি অন্তত করছি। যদি বাপ মাই আশা ছেড়ে দেয় তাহলে কি করে হবে?”
যাগগে...তারপরেও বিয়ের নেমন্তন্ন হলো... বিয়েও হয়ে গেলো! 
তারপর ছয় সাত মাস পরের কথা। হঠাৎ শুনি মায়ের ঐ মামা এসেছিলেন আমাদের বাড়ি। মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে গন্ডগোল শুরু হয়েছে…মেয়েকে নাকি মারধোর করা হয়, ঠিক মতো খেতে দেওয়া হয়না… সারাদিন ঘরের দরজায় তালা মেরে রাখে শাশুড়ি যাতে দিনের বেলা বউ ঘুমোতে না পারে। কাজের মেয়েও ছাড়িয়ে দিয়েছে… শুধু তাই নয় বরের নাকি অন্য কোনো মেয়ের সাথে প্রেম আছে। মেয়েটা সেসব জেনে ফেলাতে অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গেছে। 
এতকিছু হওয়ার পরেও মেয়ে কিন্তু বাপের বাড়িতে কিছু বলেনি। ঐ যে ভারতীয় নারী…মরে যাবে তবু শ্বশুরবাড়ীর বদনাম মুখ ফুটেও করবে না! 
কিন্তু বাদ সেধেছে শরীর… প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরেই বাপের বাড়ীর নজরে আসে বিষয়টা। তারপরেই সব জানাজানি…
নানাভাই আবার একদিন এসেছিলেন… আমি তখন বর্ধমানে। 
আমাকে দেখেই বললেন “তুমি ঠিক বলেছিলে মা। তখন যদি তোমার কথায় কান দিতাম আজ এই দিন দেখতে হতো না। আমি খুব ভুল করেছি।”
এরপরে সম্ভবত মেয়েটা গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে.. আর তারপরে নিজের গ্রামেরই এক গরীব ছেলের সাথে বিয়ে হয়। ছেলেটার পরিবার খুব অবস্থাপন্ন না হলেও ছেলেটা কিছু একটা করে…যাতে এখন অবস্থার অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। 
শুনছি মেয়েটা আপাতত খুবই সুখে আছে। 
আসলে জীবনে বংশ, টাকা, স্টেট্যাস ইত্যাদিই সব নয়… সবথেকে দরকারি ভালো থাকা আর ভালো রাখা। 
অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যে কতটা সমস্যার সেটা অভিভাবকদেরই বুঝতে হবে। ভালো ছেলের সন্ধান সবসময়ই পাওয়া যাবে… না পাওয়া গেলেও অসুবিধা নেই, কারণ বিয়েটাই জীবনের সবকিছু না। মেয়েদের শিক্ষিত করাটা, নিজের পায়ে দাঁড় করানোটা খুব জরুরী… তাহলেই সমাজের এই নারী নির্যাতনের মতো সমস্যাগুলো অনেকাংশেই কমবে বলে আমার ধারণা।
আর একটা কথা কোনো এক মহাপুরুষ বলে গেছেন.. একটা ছেলে শিক্ষিত হলে শুধু সেই শিক্ষিত হয়… কিন্তু একটা মেয়ে শিক্ষিত হলে পরের পুরো প্রজন্ম শিক্ষিত হয়। মেয়েদের শিক্ষিত হওয়াটা বহু জরুরী... অন্তত পৃথিবীর জন্য... মানুষের জন্য। বাকিসব না হয় বাদই দিলাম।

ঝুলন

এসব হলো সেই কালের কথা, যখন রাখী পূর্ণিমা রকষাবন্ধন হয়নি, দোলপূর্ণিমা হ্যাপি হোলি হয়নি।
তখন রাখীপূর্ণিমা হওয়ার একমাস আগে থেকে পাড়ায় পাড়ায় ঝুলন সাজানো হতো.. চলতো রাখী শেষ হওয়ার কিছুদিন পরেও। বাচ্চারা মাটি, পুতুল, শ্যাওলা, গাছপালা দিয়ে ঝুলন সাজাতো।
বিশেষ করে পাড়ায় বিহারী বাড়ি যেদিকে আছে সেদিকে বেশী করে ঝুলন দেখা যেতো। রাস্তার ধারের ঝোলা বারান্দা কিংবা ড্রেনের উপরের স্ল্যাবে বাচ্চারা হরেক কিসিমের ঝুলন সাজাতো। নয়ন স্যারের বাড়ির সামনে সব্জিবাজারের মুখটাতে, পুশিদিদিমণির বাড়ি সামনে, পার্কাস রোডে সারসার ঝুলনের পশরা সাজাতো বাচ্চারা... আর রাস্তা দিয়ে কেউ গেলেই পয়সা চাইতো। দশ পয়সা, পঁচিশ পয়সা.. কেউ কেউ আবার এক টাকাও দিতো।
তেঁতুলবাজারের মোড়ের মাথায় বর্ষামঙ্গল দোকানের ঠিক সামনে মুচীকাকুর পাশেই ঝুলনের পশরা নিয়ে দোকানদার বসতো সার সার। মাটির পুতুল, মাটির খেলনা হাঁড়ি কুরি সে অনেক কিছু। মাটির বাঘ, গরু,ছাগল থেকে আরম্ভ করে রামকৃষ্ণ, সারদামা অবধি পাওয়া যেতো।
আমি সারাবছর অপেক্ষা করে থাকতাম ঝুলনের সময়টার জন্য। এই সময়েই খেলনাপাতির সবথেকে সুন্দর মাটির হাঁড়ি, শেণি, থালা বাসন, কড়াই পাওয়া যেত।
শেণি সমেত হাঁড়ি নিলে এক টাকা দাম... সেই হাঁড়ির গায়ে লাল হলুদ রঙের নক্সা। দাদাভাই মাটির খেলনা কিনে দিত অনেক রকমের। আর দুইবোনের দুটো হাঁড়ি... আমি আবার ওতে সন্তষ্ট নই...আমার একখান কড়াইও চাই। আমি খেলনাবাটি খেলতে খুব ভালোবাসতাম।
কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বাড়ির বাইরে খেলা করা আমাদের মানা ছিলো.. পাড়ার মধ্যে শুধু জুঁইদের বাড়ি যেতাম.. কখনো কখনো ফুচুদের বাড়ি.. খুব ছোটো বেলায় রামিজদের বাড়িও যেতাম। আধঘন্টার বেশী বাড়ির বাইরে থাকলে দাদাভাই চেঁচামেঁচি করতেন। অগত্যা সবাই আমাদের বাড়িতে এসেই খেলতো... কেউ না এলে আমরা তিনভাই বোনেই খেলতাম।
ঝুলন বানাতে বালি লাগে... আমাদের একতলার বাথরুমের পাশে তখন বালি ডাঁই করে রাখা থাকতো.. আমাদের ফুলটুসী মুরগীটা ঐ বালিতে খেলা করতো। ফুলটুসীর মতো সুন্দর মুরগী আমি আর এজন্মে দেখলাম না। হাল্কা কালচে গোলাপী পালকের উপর সোনালী রং এর ছটা। আমার এই প্রিয় মুরগী কলকে পাতা খেয়ে একদিন ধুম করে মরে গেলো। আমি এক সপ্তাহ কেঁদেছিলাম। ফুলটুসী নিয়ে বহু গল্প আছে... সেই গল্প আর একদিন হবে।
যাইহোক, বালি ছাদে নিয়ে এসে বালির বেস করে, তারপর সিনারী সাজানোর পর্ব চলতো। গ্রামবাংলা সাজানোই সবথেকে সহজ... অতএব কলার পাতা সমেত মাটির বাড়ি বসিয়ে সেই বাড়ির সামনে লম্বা লাল সুরকির রাস্তা। ইঁট ঘষে সুরকি বানানো হতো... হলুদ সুরকি, লাল সুরকি, খয়েরী সুরকি।
গাছপালা সাজানোর জন্য ফুলটা, ছোটো ছোটো গাছ আনতে যেতাম আঙুরদার পার্কে। ওখানে অনেক রকমের ফুলগাছ আছে। তারপর তা দিয়ে বাগান, প্লাস্টিকের বাটি বালি দিয়ে ঢেকে তাতে জল দিয়ে পুকুর। আমার তিনচার খানা কালো টুপী পরা হলুদ প্লাস্টিকের হাঁস ছিলো... টিকটিকির ডিম চকোলেট ভরা ছিলো হাঁসগুলোর পেটে.. ওদের ভাসানোর চেষ্টা চলতো পুকুরের.. পুকুরের অনুপাতে হাঁস বড়ো! পুকুরের চারপাশে শ্যাওলার প্রলেপ.. তখন আমাদের বাড়ির পাঁচিলে অনেক শ্যাওলা হতো.. আর লুচিপাতা গাছ, হলদে ফুল ওলা কুকুর শোঁকা গাছও অনেক হতো। কুকুর শোঁকা ফুল কেন বলা হতো জানিনা.. তবে সবাই বলতো।
যাগগে, ঝুলন তো সাজানো হলো। কিন্তু আমাদের ছাতে এসে আর কে ঝুলন দেখবে!! টাকা পয়সাও পাওয়া যাবে না! কি দুঃখ , কি দুঃখ। অগত্যা আম্মু, আব্বু, দাদি, দাদা সবাইকে টেনে এনে ঝুলন দেখাতাম... দাদা টাকা দিয়ে দিতেন। একটাকা, দুটাকা কিংবা পাঁচটাকা! দাদি আর আব্বু দিতো না! আমার আব্বুর কাছে তখন টাকা পাওয়া বিশাল ব্যাপার... তাও এমনি এমনি দিতো না। একটা পাকা চুলে দশপয়সা দিতো! তখন বেশী পাকা চুল নেই, আর টাকাও নেই! আমি মনে মনে বলতাম আব্বুর চুলগুলো সব পাকা করে দাও আল্লাহ! সে শখ আর পূর্ণ হতো না।
এখন আব্বুর অনেক চুল পেকে গেছে... এখন আর এক টাকায় একটা ইক্লেয়ার কিংবা পঞ্চাশ পয়সায় হাঁস মুরগীওলা টিকটিকির ডিমও পাওয়া যায়না।
এখনকার বাচ্চারা ঝুলনও সাজায় না আর!
তারা এখন ক্যান্ডিক্রাশ আর ফিফা খেলে!
আমাদের ছোটোবেলাগুলো বড়ো রঙিন ছিলো... জলরং এ আঁকা রঙিন স্বপ্নের মতো ..

ফুলটুসী: দ্বিতীয় পর্ব

ফুলটুসীকে তো বগলে করে বর্ধমানের বাড়িতে নিয়ে এলাম। ফুলটুসী বেজায় অবাক। এ আবার কোথায় এলাম রে বাবা! গাছ নেই, ঘাস নেই, মাটি নেই, আকাশ আছে বটে তা সেই ছাদে উঠলেই শুধু দেখা যায়... আজব পৃথিবী। 
প্রথম কদিন ফুলটুসীকে বেঁধে রাখা হলো... দুদিন পরে ফুলটুসী দিব্যি ঘর চিনে গেলো। অনিতা সিনেমা লেন থেকে ফুলটুসীর জন্য ফল রাখার কাঠের বাস্কেট আনা হলো। আজ থেকে ফুলটুসীর দরমা ঐটায়। ফুলটুসী মন খারাপ হয়েছিলো কিনা জানিনা... মুরগীরা বোধহয় কাঁদে না, মন খারাপ করেনা... কিংবা করে কে জানে! ফুলটুসী কিন্তু দিব্যি মানিয়ে নিলো বর্ধমানে। যখন মন হতো টুকটুক করে ছাদে চলে যেতো। সকাল বেলা কুঁক কুঁক করতে করতে একতলা থেকে দোতলায় চলে আসতো দিব্যি... দাদি আর আম্মু রান্নার জন্য সব্জি কাটছে, মাছ কুটছে... ফুলটুসী মনের আনন্দে ফেলে দেওয়া কানকো, লাউয়ের খোসা খাচ্ছে।
লোকে বলে ছাগলে কিনা খায়... আমি বলি মুরগীতে কিনা খায়... মুরগীকে মুরগীর মাংস দিলেও খেয়ে নেবে সোনা মুখ করে।
সেই ফুলটুসীকে হঠাৎ একদিন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না...হঠাৎ করেই। আমি তো হাত পা ছড়িয়ে চীৎকার করে কাঁদছি...
নীচে থেকে দাদা দৌড়ে চলে এসেছেন "কি হলো বড়কির ? কাঁদছে কেন? কে মেরেছে? আয় আয় আমার কাছে আয়... কারোর কাছে যেতে হবেনা। আমি তোমাকে অনেক মুরগী কিনে দেবো বুবু... কাঁদে না।"
তারপর আম্মু আর দাদির দিকে রেগে বললেন.. "তখন থেকে মেয়েটা কাঁদছে! দ্যাখো না মুরগীটা গেলো কোথায়!"
আমার দাদা ছিলেন খুব রাগী... সবাই খুব ভয় পায় , যাকে বলে থরহরিকম্প। এমনকি বিকেলে দাদার কাছে ফলের খোসা খেতে আসা ছাগলেরাও দাদাকে ভয় পায়। একবার দাদার শরীর খুব খারাপ... খারাপ মানে যাকে বলে যাচ্ছেতাই খারাপ। পাড়ার
লোকজন সবাই জড়ো হয়ে গেছে... পার্টি অফিস থেকে লোকজন দৌড়ে চলে এসেছে। অক্সিজেন সিলিন্ডার, ডাক্তার সে এক হৈ চৈ ব্যাপার। আমার ছোটো ফুফাজান কোথা থেকে একখান কোরআন শরীফ এনে দাদার মাথার কাছে পড়তে শুরু করে দিলেন। সবাই গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে... এখুনি মরে যাবে দাদা।
আমার খুব মনখারাপ... দাদা সত্যিই মরে যাবে?
এমন সময় দাদা হুঙ্কার দিয়ে উঠলো... "দূর হয়ে যাও সব এখান থেকে! ইয়ার্কি হচ্ছে অ্যাঁ? আমি এখনি মরছিনা । ওসব কোরাণ শরীফ নিয়ে দূর হয়ে যাও আমার দুচোখের সামনে থেকে!"
সেই চীৎকার শুনে কোরাণ শরীফ নিয়ে ফুফাজান প্রায় খাট থেকে পড়ে যায় যায় অবস্থা! একরকম দৌড়ে পালিয়ে বাঁচেন! এদিকে ঘরও প্রায় ফাঁকা হয়ে গেলো সেই হুঙ্কারে!
একমাত্র প্রাণী যে দাদাকে ভয় পায়না সে হলো আমি! দাদার মুখে তর্ক, দাদাকে বকা প্রায় সবই আমি করি। দাদাকে প্রশ্ন করে তিতিবিরক্ত করে দিই...বিরক্ত হয়ে দাদা বলেন "জজব্যারিস্টার হবে বড়ো হয়ে, উফ! জানটা খারাপ করে দিলে বকে বকে!!! দূর হয়ে যাও চোখের সামনে থেকে"
আমার সেই রাগী দাদাই এখন আমাকে কোলে করে ভোলাচ্ছেন!
নানাভাই এসেছেন সেইসময়। আমার নানাভাই শিল্পী মানুষ... অসাধারণ ছবি আঁকেন। শান্ত শিষ্ট ধবধবে ফরসা কমকথা বলা একটা লোক... হাঁপানির রুগী ।
তিনিও শশব্যস্ত হয়ে মুরগী খুঁজছেন। বাড়ির সবাই মুরগী খুঁজতে ব্যস্ত। প্রায় আধঘন্টা হয়ে গেছে... আম্মু প্রায় নিশ্চিত কুকুর কিংবা বিড়ালে ফুলটুসীকে মেরে ফেলেছে! এমন সময় কি মনে হতে ছাদের সিঁড়ি ওঠার চাতালে পড়ে থাকা অ্যালুমিনিয়ামের গামলাটা তুলতেই দেখে ..অজ্ঞান ফুলটুসী!
ছাদে যেতে গিয়ে ডানার ঝাপটে কোনোভাবে সে গামলা চাপা পড়ে গেছে... তারপর আর বেরোতে পারেনি! আধঘন্টা চাপা থেকে অক্সিজেনের অভাবে তার এই দশা!
আমি তো ফুলটুসীর ঐ অবস্থা থেকে আরো কান্নাকাটি জুড়েছি। আম্মু তখন ফুলটুসীকে নিয়ে এসে দাদির ঘরে ফ্যানের তলায় রেখে পানির ঝাপটা দিচ্ছে, পানি খাওয়াচ্ছে। প্রায় মিনিট পনেরো পরে টলতে টলতে ফুলটুসী উঠে দাঁড়ালো... আমি জড়িয়ে ধরলাম আমার ফুলটুসীকে।
তারপর থেকে ফুলটুসীর যাতায়াতের রাস্তায় বালতি, গামলা কিছুই রাখা হতো না। সে নিশ্চিন্তে একতলা থেকে ইচ্ছামতো ছাদে যেতো।
(চলবে)

ফুলটুসী - ১

আমার একটা দেশী মুরগী ছিলো, নাম ফুলটুসী। ঐরকম সুন্দর মুরগী আমি জীবনে আর একটা দেখলাম না। হাল্কা বেগুনি রঙের দেহ আর গলায় সোনালী পালক। 
ফুলটুসী ছিলো আমার প্রথম পোষ্য যার কারণে আমি বহুবছর মুরগী খাওয়া বন্ধ রেখেছিলাম। 
তখন ক্লাস টু কিংবা থ্রিতে পড়ি। মামারবাড়ি গেছি গরম কিংবা পুজোর ছুটিতে ঠিক মনে নেই। তখন মামারবাড়ি ছিলো রূপকথার রাজ্য। নানাভাই নানীজান মামারা...আমবাগান, কাঁঠানবাগান, পুকুর ঘাটে রূপচাঁদা মাছ আর দামোদরের চর। 
আমরা শ্যালোতে গা ধুতাম হুল্লোড় করে...একবার গায়ে বিছুটি ঘষে গেছিলো! সে কি কান্ড... হু হা করে হাত জ্বলছে।আমরা তত লাফাচ্ছি পানির মধ্যে। 
শ্যালোর পানি প্রচন্ড ঠান্ডা হতো... কাঁচের মতো পরিস্কার... সেই পানি তিরতির করে আল বেয়ে চলে যেতো ধানক্ষেতে। 
তো এমন মামারবাড়িতে গেলে কে আর ফিরতে চায় কাঠলোহার শহরে? 
কিন্তু ফিরতে হবেই। আব্বু নিতে এসেছে... ভোর পাঁচটায় সবকটাকে ঘুম থেকে তুলে দিলো। আব্বু তখন কেমন যেন হিটলার টাইপ ছিলো... নইলে ওতো ভোরে কে বাড়ি যায়? অমি হাত পা ছুঁড়ে কাঁদছি... বাড়ি যাবো না। আরো দিন কয়েক থাকবো। ঐদিকে আব্বু হাতের নড়া ধরে হিড়হিড় করে টানছে। মোষের গাড়ি সেজেগুজে রেডি। নানিজানের চোখে পানি। নানিজান সান্ত্বনা দিচ্ছে আবার চলে আসবে বুবু... কাঁদে না। 
হঠাৎ আমার চোখ পড়লো পাঁচিলের দিকে। আমার ফুলটুসি (তখনো নামকরণ হয়নি) পাঁচিলে গলা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে... সকালের নরম আলো সোনালী পালকে পরে চকচক করছে। দেখে আমি মুগ্ধ। ব্যস, আর যায় কোথা! অজুহাত রেডি। 
আমি ডিক্লেয়ার করলাম ঐ মুরগী ছাড়া আমি কোত্থাও যাবো না। সবাই হতবাক। ছাড়া মুরগী ধরা এক কঠিন কাজ। নানিজান বললো আগে জানলে আমি দরমাতেই আটকে রাখতাম। এদিকে আমি মুরগী ছাড়া বাড়ি যাবো না। অতএব নানাভাই মুনিশদের হুকুম দিলেন মুরগী ধরার জন্য। সবাই মুরগী ধরতে ব্যস্ত। মুরগী দৌড়ায়, পিছনে লোকজন দৌড়ায়.. শেষে বহুকষ্টে মুরগী ধরা পড়লো.. তারপর মুরগীকে প্যাকেটে ভরে, শুধু মুখটা থলি থেকে বের করে আমাকে দেওয়া হলো। আমি মুরগী বগলদাবা করে মোষের গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি বাসস্ট্যান্ডের দিকে রওনা দিলো...মোষের গলায় ঘন্টা টুনটুন করে বাজছে। শিং এ প্লাস্টিকের মালা জড়ানো। 
ওদিকে মুরগীর নামকরণ কমপ্লিট। ফুলটুসীর বুক তখন ধড়ধড় করছে ভয়ে... আমি মাথায় হাত বুলিয়ে সাহস দিয়ে চলেছি। 
বাসে জানালার ধারে বসে.. সারাবাসের লোক অবাক হয়ে দেখছে ফ্রক পড়া পুঁচকি একটা মেয়ে কোলে মুরগী নিয়ে বসে.. 
সাঁই সাঁই করে বাস চলেছে বর্ধমানের পথে, ফুলটুসীর নতুন বাড়িতে। 
(চলবে)

কর্মজীবি নারীদের দিনে

ক্লাস এইটে ওঠার পরে গ্রামের স্কুল থেকে অন্য গ্রামের স্কুলে যেতে হবে বলে বাড়ি থেকে পড়াশোনা ছাড়িয়ে দেয়... অতোটা রাস্তা... রাস্তাটাও ভালো না। বাড়ি আসতে সন্ধ্যে হয়ে যায়। বিয়ের জন্য কথাবার্তাও শুরু হয়। একবছর কান্নাকাটি জোর জবরদস্তি করে পাশের গ্রামের স্কুলে ভর্তি হয় মেয়েটি। অভাবের সংসারে মেয়ে হয়ে নতুন বই কিংবা টিউশন নেওয়ার অাশা স্বপ্ন। অন্যের কাছে বই চেয়ে পড়াশোনা করে শেষঅবধি কলেজ পাশ করে।
চাকরি করা হয়ে ওঠেনি শেষ অবধি। চাকরি করা যাবেনা এই শর্তে স্বচ্ছল ঘরের একমাত্র পুত্রবধূ হয়ে এসেছিলো সেই মেয়ে। তারপর তার কাজ হয় নিজের মেয়েদের বড়ো করে তোলার যুদ্ধ। ছোটো থেকেই তাদের মনে গেঁথে দেওয়া হয় বড়ো হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে তোমাদের। তার মেয়েরা আজ প্রতিষ্ঠিত।
এটা আমার আম্মুর গল্প...
জমিদারবাড়িতে বিয়ে হলেও স্বামীর সাথে এককাপড়ে সন্তানসহ বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। হাতে একটা পয়সাও নেই। শুধু আছে কয়েকবিঘা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি। নিজের গয়না বিক্রী করে সেই টাকায় কিছু জমি কিনে শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে সন্তানের ক্যান্সার ধরা পরে। তার চিকিৎসায় জমিজায়গা বিক্রী হয়ে যায়। তবুও হাল ছাড়েনা মেয়ে। গ্রামের স্কুলে ফোর অবধি প্রথম হয়েছে সে... বিয়ের কারণে আর পড়াশোনা না হলেও পাঁচ সন্তানকে শিক্ষা দেয় কষ্ট করেও। মুরগী পুষে, গরু , ছাগল পুষে সংসার চলে ঠিক।
এটা আমার নানীজানের গল্প।
ষাটের উত্তাল দশক। স্বামী অধিকাংশ সময়েই ফেরার। বিখ্যাত নকশাল আন্দোলনের জের। বাড়িতে প্রতিদিনই কেউ না কেউ লুকিয়ে থাকে। তারপর আছে আশ্রিত মানুষেরা। ছোটো ছোটো সন্তানদের নিয়ে সংসার। ডিম ,দুধ সব্জি বেচে সংসার চলে। চাষবাসের দায়ও তার ঘাড়ে.... একা হাতে সব সামালায় কন্যা।
এটা আমার দাদির গল্প।
জমিদার বাড়িতে বিয়ে হয়েছে জমিদারের কন্যার। অপূর্ব সুন্দরী কন্যা আবিষ্কার করে স্বামীর সাথে অন্য নারীর সম্পর্ক।
মেয়ে আর একদিনও শ্বশুরবাড়িতে থাকেনি।
ঐ সময়ে শ্বশুরবাড়ি স্বামী ছেড়ে চলে আসা একটা অন্যরকম লড়াই।
গল্পটা আমার মামাবাড়ি সম্পর্কিত এক নানীজানের।
প্রেম করেছে মেয়ে। বাড়ি থেকে বিয়ে দিতে রাজী নয়। ছেলের সবদিক থেকেই উপযুক্ত। তাও বাড়িতে রাজী না। মেয়ে নিজে পছন্দ করে বিয়ে করবে তাও আবার প্রেম করে ? ছিঃ লোকে কি বলবে? মোদ্দা কথা , এটা সেই যুগে অসম্ভব একটা ব্যাপার ছিলো। ভালোবাসাকে মর্যাদা দিতে সেই "অসভ্য" মেয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। অবাধ্য মেয়ের সাথে বাপের বাড়ি সম্পর্ক রাখেনি বহুদিন। সেই যুগে এটা করতে অনেকটা সাহস লাগতো। গল্পটা আমার আম্মুর ফুফুআম্মার গল্প।
নারীরা কখনো কর্মহীন হয়না। প্রতিটা নারীর জীবনে থাকে অনন্য লড়াইয়ের গল্প। কেউ জয়ী হয়, কেউ হয়না।
কিন্তু লড়াইটা থেকে যায়। গল্পে কিংবা ইতিহাসে।
কর্মজীবি নারীদের দিনে সব নারীদের সবরকম লড়াইকে কুর্ণিশ।

কুন্তলদা

সদ্য অর্কূট খুলেছি... এই ধরুন ২০০৭ সাল হবে। কলেজে তখন সদ্য ভর্তি হয়েছি। তখন বাড়িতে নেট ছিলো না, কম্পিউটারও না। সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে ঘন্টাপ্রতি দশ টাকায় নেট করতে হতো। বড়োবাজারের কোহিনূর কাটার্সের পিছনের সাইবার ক্যাফেতে বসে প্রথম অ্যাকাউন্ট খুললাম। আমার বোনই খুলে দিয়েছিলো। সবাইকে বন্ধুত্ব অনুরোধ পাঠাচ্ছি। তখনই খুঁজে পাই কুন্তলদাকে, কুন্তল ব্যানার্জী। ভুল করে অন্য লোক ভেবে অ্যাড করেছিলাম। কলেজে আমার সাথে কুন্তল বলে একটা ছেলে পড়তো ... সায়ন্তীর সাথে মিউচুয়াল থাকায় ভেবেছিলাম এই সেই ছেলে। রিকু দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় অ্যাক্সেপ্ট করে। তারপরে বেশ কিছুদিন পরে জানতে পারি এ আমাদের ক্লাসের কুন্তল না। আমার থেকে সিনিয়র এবং বেশ অনেকটাই বড়ো।
২০০৯ নাগাদ বাড়িতে নেট কানেকশন আসে। ল্যাপটপও কিনে দেয় আব্বু। ততদিনে খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেছে কুন্তলদা। আর অানফ্রেন্ড করিনি।
আমরা একসঙ্গে ফার্মভিলা খেলতাম, সিটিভিলা খেলতাম... চ্যাট করতাম, গল্প করতাম নানা বিষয়ে। মূলত গল্পের বই নিয়েই। 
তারপর একদিন দেখাও করি। প্রথমবার যেবার দেখা করার কথা... আমি বেমালুম ভুলে গেছিলাম... ওদিকে কুন্তলদা হলদিরামের কাছে দাঁড়িয়ে আমার অপেক্ষায়... এদিকে আমি তখন ব্যান্ডেল পেরিয়ে বর্ধমানের দিকে। কুন্তলদা যখন আমাকে ফোন করে, তখন আর ফেরা সম্ভব না। কিছুই মনে করেনি কুন্তলদা... আমি কিন্তু খুবই লজ্জিত হয়েছিলাম। পরে অবশ্য দেখা হয়েছে বহুবার। রোগা, ফরসা, লম্বা , শান্ত ছেলেটা... 
কলকাতা যখন প্রথমবার আসি... কলকাতা আমার একদমই পছন্দ ছিলোনা। কুন্তলদার হাত ধরে প্রথম কলকাতা চেনা, কলকাতাকে ভালবাসতে শেখা। কলেজস্ট্রিট, কফিহাউস, প্যারামাউন্ট হয়ে কলেজস্কোয়ার... বৃষ্টির কলকাতায় কাঁচা আম খেতে খেতে এক ছাতার তলায় হাঁটতে হাঁটতে দুজনে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় নিয়ে আলোচনা করতাম। আমাদের দুজনেরই প্রিয় লেখক ছিলেন শীর্ষেন্দু আর সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। 
তারপর ছিলো ফুচকা খাওয়া... মোদ্দা কথা আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একজন ছিলো কুন্তলদা। বন্ধু, খেলার সাথী, কলকাতার সাথী। এইভাবেই দুটো বছর চলে যায়। আমার জীবনে আসে মাজহার। তার একেবারেই পছন্দ ছিলোনা কুন্তলদাকে। চ্যাট করলে কিংবা দেখা করলে সে ভীষণ রেগে যেতো... ঝগড়া করতো। কিন্তু তারপরেও আমি কুন্তলদার সংস্পর্শ ছাড়তে পারিনি। সেই কুন্তলদা চলে গেলো আইআইটি কানপুরে রসায়ন নিয়ে গবেষণা করতে । আদ্যান্ত ফুটবলপাগল, কবিতাপ্রেমিক ছেলেটা কলকাতা ছেড়ে চলে গেলো উত্তরপ্রদেশ। ততদিনে আমারোও পড়া শেষ... আমিও চলে গেলাম ব্যাঙ্গালোরে। কিন্তু দুজনের বন্ধুত্বে এতটুকু ভাঁটা পরেনি। প্রতিবছর জন্মদিনে আমার কাছে একটা আর্চিসের কার্ড আসতো... কোনোবার ভুল হয়নি। আমার মন খারাপ, ব্রেক আপ, জীবনের সব কঠিন সময়ে সে আমার পাশে থেকেছে। আমার ভাই বোনের সাথেও তার সুসম্পর্ক ছিলো। 
হঠাৎ করে ২০১৬ সালে জানতে পারি... কুন্তল ব্যানার্জী বলে আদতে কেউ নেই। একটা ফেক নামের প্রফাইলের পিছনে অন্য একটা মানুষ... আসল নাম অভি মুখার্জ্জী। আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি প্রথমে। কুন্তলদা নিজেই বলেছিলো তার আসল পরিচয় ... ক্ষমা চেয়েছিলো প্রায় দশবছর নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে রাখার জন্য। আমি ক্ষমা করেছিলাম... কারণ আমার কাছে নামটা নয়, মানুষটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কুন্তল ব্যানার্জ্জী আমার জীবনের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলো। শুধু আমি তাকে বলেছিলাম পৃথিবীতে আর সবাই কি বলে ভাবে জানি না, আমি তোমাকে কুন্তলদা বলেই ডাকবো। 
অদ্ভুতভাবে, অভি মুখার্জ্জী ছেলেটা অালাদা... একদমই আলাদা। কুন্তল ব্যানার্জীর ধারে কাছেও আসেনা। অভি ব্যানার্জ্জী এখন সাম্প্রদায়িকতা সমর্থন করে, বিজেপি করে। 
ফেসবুকের মার্কামারা সাম্প্রদায়িকদের সাথে তার ওঠাবসা। গতকাল বিজেপির গোপন ফেসবুক গ্রুপের একটা screenshot এ কুন্তলদার কমেন্ট দেখে অবাক হলাম। 
এই কুন্তলদাকে আমি চিনতাম না, এ অভি মুখার্জ্জী। 
শীর্ষেন্দুপাগল মোহনবাগানী এই লোককে আমি চিনি না। শীর্ষেন্দুর কিশোর সাহিত্য প্রেমিক, শ্রীজাতর কবিতার বই উপহার দেওয়া , কলেজস্কোয়ারে বসে নবীগঞ্জের দৈত্য কিংবা আনন্দমেলা নিয়ে গল্প করা লোক আজ দাঙ্গা অস্ত্র নিয়ে আলোচনা করছে। মুসলমানদের কি করে জব্দ করা যায় তার প্ল্যান কষছে... 
হয়তো এ পোড়া দেশে কিছুই এসে যাবে না কারোর। কিন্তু কুন্তলদা বলতে অজ্ঞান ঊনিশ বছরের সেই মুসলমান মেয়েটির কাছে আর কুন্তলদার অস্তিত্ব নেই। শুধু আছে গলার কাছে জমে থাকা একদলা কষ্ট। কুন্তলদা এখন শুধুই বিজেপি সমর্থক ডক্টর অভি মুখার্জ্জী।

There is only one Earth, There is no Planet-B

সারা পৃথিবী জুড়ে ১.৫ মিলিয়ন বাচ্চা রাস্তায় নেমেছে। আমাদের পৃথিবীটার জন্য... যে পৃথিবীটাকে আমাদের মতো বড়োরা নষ্ট করে দিয়েছে কিংবা দিচ্ছে।
প্রথম ক্যাম্পেন শুরু করে সুইডেনের গ্রেটা, মাত্র ষোল বছরের সে বুঝে গেছে এই বিশাল মহাবিশ্বে আমাদের আর ঘর নেই... একটাই ঘর, সেটা আমাদের পৃথিবী। এটা নষ্ট করে দিলে কোথাও যাওয়ার জায়গা যে নেই আমরা সেটা না বুঝলেও, ওরা বুঝেছে। তাই রাস্তায় নেমে চীৎকার করছে এই পৃথিবীটা রক্ষা করতেই হবে।
এসব দেখে গলার কাছে দলা পাকানো কান্না জমে ওঠে... ভরসা জেগে ওঠে আবার। নাহ, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের থেকে একদম অন্যরকম। এরা পৃথিবীর কথা ভাবে, মানুষের কথা ভাবে। এরা আমাদের মতো যুদ্ধবাজ নয়, দ্বেষ নিয়ে বড়ো হয়নি।
পৃথিবী আজ হাজার হাজার গ্রেটাতে ভরে গেছে।
আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম পারবে এই সুন্দর পৃথিবীটাকে বাঁচাতে, তাদের পারতেই হবে।
There is only one Earth, There is no Planet-B.

নববর্ষ

তখনো আজকের মতো যান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি পৃথিবীটা। আমার দোতলা বাড়ি থেকে আসিফ স্যারের বাড়ির নারকেল গাছগুলো তখন দেখা যেত ছাদে উঠলেই..... ক্লাবের সামনে কদম গাছটাও তখন পাতা নেড়ে নেড়ে নিজের খুশি জানাতো... এই তো জাস্ট কিছু বছর আগের কথা বলছি... সেই সময়ের গল্প যখন এক টাকায় তিনটে ফুচকা, দুটাকায় একটা বাপুজীর কেক, পঞ্চাশ পয়সায় রঙিন কাঠিওলা আইসক্রীম পাওয়া যেত.... স্কুলের গেটের সামনে আচার কাকু এক টাকায় এত্তোটা আলু কাবলি দিতো। তখন আমার কাছে একটা টাকা মানে অনেক টাকা.... এক টাকায় অনেক জলছবি পাওয়া যেত... পানি দিয়ে ঘষে আস্তে করে কাগজটা তুললেই রং বেরং এর গল্প ফুটে উঠতো পাতায়।
আমার আব্বু তখন বেশ গরীব, ছাপোষা মধ্যবিত্ত যে কিনা তিন ছেলে মেয়ের লেখাপড়া, আব্বা মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমসিম। চাষবাস করে কতো আর ইনকাম, তাই শহরে থাকা সব কিছুই কিনে খাওয়া।
আমরা বেশ ভালো স্কুলেই পড়তাম, বর্ধমানের সেরা সরকারি স্কুল.... সেরকম খরচা ছিলো না তারপরেও বইখাতা , তবলার স্যার, আঁকার সরঞ্জাম, গানের স্যার , জিমন্যাস্টিক সবের খরচা চালাতে চালাতে আমার আব্বুটা বেশ গরীব! একটা বিলাসিতা করারও টাকা নেই। একটু দূরে কারোর বাড়ি যেতে হলে হেঁটেই যেতে হবে.... পনেরো টাকা রিকশা ভাড়া অনেক! আমার সদ্য হাঁটতে শেখা ভাইটা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে আব্বু আম্মুর হাত ধরে ঝুলতে ঝুলতে যাচ্ছে!!! এই তো সেদিনের কথা।
মোট কথা তখন আমরা বেশ গরীব।
আমার আম্মু একজন অসাধারণ মহিলা। অন্নপূর্ণা বলতে যা বোঝায় ঠিক তেমনি। কপালে লাল একটা টিপ, হাতে দুগাছা সোনা বাঁধানো পলা। আমার আম্মু গৃহবধু.... সারাদিন ঘরের কাজ , রান্নাবান্না, তারপর আমাদের পড়ানো! তখন আমাদের বাড়িতে কাজের লোক নেই, ছুটির দিনে আমি আর নিউ দুটো করে চারটে ঘর মুছতাম, বাকিটা আম্মু! কতই বা বয়স হবে তখন দশ কি বারো কিংবা আরো ছোটো।
বার্ষিক পরীক্ষার পরে একমাস ছুটি.... সেই সময়টাতেই নববর্ষ আসতো হৈ হৈ করে। আমাদের বর্ধমানে একমাস ধরে চৈত্র সেল চলে। সেকি হৈ হৈ ব্যাপার! রাস্তায় বেরোনো মুশকিল। আমার আম্মু চৈত্রসেলের শেষ দিনে দুই বোনের জন্য দুটো ফ্রীল দেওয়া ফ্রক কিংবা অ্যালান ফ্রক কিনে দিতো। হাল্কা মিষ্টি রঙের। সারা বছর ধরে একটাকা দুটাকা করে জমিয়ে বছর শেষে আমার গৃহবধু আম্মুটা ছেলে মেয়েদের জন্য জামা কিনতো, আব্বুকে অনেক সময় না জানিয়েই।
আহা, নববর্ষের দিন নতুন জামা গায়ে ঠেকাতে হয় যে। অনেক ঘুরে ঘুরে সস্তাতে সুন্দর জামা হতো যেখানে , সেখান থেকেই নতুন জামা কেনা হতো। আমরা নতুন জামার আনন্দে উৎফুল্ল। এদিকে জানতেও পারলাম না আমার আব্বু আম্মু কিন্তু পুরোনো জামা পরেই নববর্ষ করছে।
নববর্ষের দিন গ্রামে আমাদের পুকুরে জাল ফেলা হতো। ঐদিন মাছ বিক্রী করলে একটু বেশি টাকা পাওয়া যাবে এই আশায়! ভোরবেলা কমলাদাদা এসে ঝুড়িতে করে মাছ ফেলতো সদর দরজার কাছে ছোটো কলের মুখে। আম্মু মাছ বাছছে ইঁটে ঘষে ঘষে, আমিও বড়ো হওয়া প্রমাণের চেষ্টায় হেল্প করার চেষ্টা করতাম মাঝেমধ্যে। সকালে আম্মু ঘুম থেকে তুলে দিয়েই হারমোনিয়ামটা বের করে দিতো। নববর্ষের দিনে গানের রেওয়াজ মাস্ট আর তারপর বাংলা পাঠ্যবইয়ের কবিতা পাঠ। ঐদিন নাকি গান না গাইলে বা বই না খুললে সারা বছর আর পড়াশুনা হবেনা! দেবী সরস্বতী পালিয়ে যাবে!!! যদিও বছরে দুবার নববর্ষেই আম্মু একই কথা বলতো!
আমরা দুবোনে শুরু করতাম এসো হে বৈশাখ গান দিয়ে, প্রতিবছর। তারপর গানের রেওয়াজ শেষ হলে স্নান করে নতুন জামা। সেদিন বাড়িতে ভালো কিছু খাবার বানানো হবেই, পোলাও,মাছের কালিয়া , মিষ্টি, হোয়াইট হাউসের দৈ এরকম অনেক কিছু।
বিকেলে আরো মজা... হাল খাতার নেমন্তন্ন দোকানে দোকানে। আব্বু আম্মুর সাথে বেরিয়ে পড়তাম নেমন্তন্ন রক্ষা করতে... কোনো কোনো দোকান আবার কোল্ড ড্রিংকস খাওয়াতো... বাকিরা সরবৎ, কেউবা ডাবের পানি। তখন কোল্ড ড্রিংকস মানে বিশাল একটা ব্যাপার। মিষ্টির প্যাকেট আর ক্যালেন্ডারে ভরে যেতো খাওয়ার টেবিলটা।
আমরা প্যাকেট খুলে খুলে ভালো ভালো মিষ্টিগুলো হাপিশ করে দিতাম লুকিয়ে লুকিয়ে।
এখন অনেক বড়ো হয়ে গেছি... জীবনযাত্রার মান বদলে গেছে।
এখন আম্মু আব্বু নয়, আমিই নববর্ষে নতুন জামা কিনে দিই ওঁদের। কমলাদাদাও এবছর মারা গেছেন। আমাদের পুকুরে জাল ফেলার জন্য অন্য গ্রাম থেকে লোক আনতে হয়.... এখন আমাদের একটা ছোট্ট মাছের আড়ৎ হয়েছে যেখানে হালখাতা হয়... সে আর এক নতুন গল্প।
আর আমাদের শৈশবের হাল খাতার মতো উৎসাহ আর নেই। পরিবর্তনের হাওয়ায় ফুটপাতের সেলের জামার বদলে স্থান পেয়েছে প্যান্টালুনস, ব্র্যান্ড ফ্যাক্টরি। যুগের হাওয়ায় ভেসে গেছি আমরাও... তবু আমার মফস্বল শহরটাতে প্রতিবার বৈশাখ আসে... লাল দড়িতে বাঁধা নতুন খাতা, আমপাতার গন্ধে মিলেমিশে যায় আমার শহরের প্রতিটা অলিগলি। এখনো আমরা নতুন জামা পরি , হালখাতার নেমন্তন্ন খেতে যাই... শুধু আমার আম্মুর এক এক করে কষ্টের জমানো টাকায় নতুন জামার ঘ্রাণ আর পাইনা। আমরা বড়ো হয়ে গেছি... আসলেই অনেকটা বড়ো।
অনেকগুলো নববর্ষ পেরিয়ে আরো একটা নতুন বছর এসেছে।
শুভ নববর্ষ সবাইকে... ভীষণ ভালো কাটুক আগামী বছরটা।
দুবছর আগে লিখেছিলাম।

গজালে

আমার খালামণির বাড়ি নলডাঙা। সেখানে হরেকরকম মজার লোক আছে। প্রায় প্রতি গ্রামেই এইরকম মজার লোক থাকে। এরকমই একজন হলো গজাল। গজালের নাম গজাল কেন জানিনা। ভাইয়ের নাম সম্ভবত পেরেক। 
যাগগে, গজালকে ছেলেবুড়ো সবাই আদর করে গজালে বলে। গজালের বোধবুদ্ধি বেশ কম... শিশুদের ন্যায় বলা যায়। তা সেই গজালেকে একবার দায়িত্ব দেওয়া হলো বর্ধমানে গরু নিয়ে যাওয়ার। বাঁকুড়া মোড়ের কাছে সে আমাদের মুনিশকে গরু দিয়ে আম্মুর ছাগলকে গজালের হাতে ট্রান্সফার করবে। 
আমাদের গ্রামে ছাগলের যত্ন আত্তি হচ্ছে না বলে ছাগলকে খালামণির বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছে। ছাগলের বাচ্চা কাচ্চাও হচ্ছে না। আম্মু খুবই চিন্তিত। আম্মু সেই কবে কোন যুগে নব্বই টাকা দিয়ে একটা ছাগীছানা কিনেছিলো... তার ছানাপোনা বেড়ে বেশ অনেকগুলো হয়েছে। আম্মু গ্রামের গরীব লোকজনকে এই ছাগলের ছানাদের ভাগে দেয়। খাসী হলে কালিপুজো কিংবা বকরিদের সময় বিক্রি করে দেওয়া হয়।
মাঝেমধ্যে আম্মু গ্রামে গেলে লোকজন ছাগলদের দেখাতে নিয়ে আসে আম্মুর কাছে।
যাগগে, গজালে গরু আনছে... আর এদিক হতে আমাদের মুনিশকাকু ছাগল নিয়ে যাচ্ছে। যথাসময়ে দুজনের দেখা হলো...
এবার অদলবদলের পালা। হঠাৎ করে গজালে বেঁকে বসলো। সে কিছুতেই গরুর বদলে ছাগল দেবে না।
সে বলছে "আমাকে বোকা পেইচো অ্যাঁ? গরুর বদলে ছাগল আমি দিবোনা কিচুতেই। গরুর দাম বেশি, ছাগলের দাম কম।"
অনেক কষ্টে শেষে তাকে বোঝানো গেলো গরু ছাগলের মালিক একজনই... এখানে গরুর বদলে ছাগল বিক্রি করা হচ্ছে না।
তা সেই গজালের বিয়ে। গজাল খুবই খুশী।
সারাদিন অনুষ্ঠান হওয়ার পরে গজালে নতুন বউয়ের জন্য একটা আপেল আর ছুরি নিয়ে বাসরঘরে ঢুকলো।
বাসরঘরে ঢুকে সে বউকে সারপ্রাইজ দেবে আপেল দিয়ে। তাই সে কি করলো ছুরিটা একহাতে নিয়ে আপেলটা অন্যহাতে পিছনে নিয়ে (যাতে বউ দেখতে না পায়) দরজার ছিটকিনি তুলছে। এদিকে বউ দেখছে হাতে ছুরি নিয়ে গজালে দরজায় খিল দিচ্ছে। বউ ভাবছে গজালে তাকে খুন করতে আসছে। বউ যত চেঁচাচ্ছে... গজালেও চেঁচাচ্ছে ছুরি না আপেল আপেল করে।
বউ জানের ডাহায় ওসব শুনবে কেন? শেষে বউ কোনোক্রমে দরজা খুলে পালিয়ে যায়। এই বউ আর ফিরে আসেনি।

সবেবরাত, ইবাদতের রাত

সবেবরাত, ইবাদতের রাত। আম্মু বলে আজকে গভীর রাতে নাকি গাছেরাও সিজদা করে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। সে দৃশ্য সবাই নাকি দেখতে পায় না। খুব আমলদার ইমানদার ভাগ্যবান রাই দেখতে পায়। ছোটো বেলায় একবার সারা রাত জেগে বসে থাকার চেষ্টা করেছিলাম। পেলামই না দেখতে। অতো ভাগ্যি বোধহয় নেই, তার উপর আল্লাহ মিঞার খুব একটা প্রয়ি নই, সেটা লাস্ট কিছু বছরে পরিস্কার বুঝে গেছি। আম্মু বলে আল্লাহর নির্দেশে সবেবরাতের রাতে ফেরেস্তারা আসেন সারা বছরের ভাগ্য লিখতে। লাস্ট বছর হেব্বি খারাপ ভাগ্য লিখছিলেন ভদ্রলোকেরা , আই মিন টু সে, ভদ্রফেরেস্তারা। লিখবার আগে একটু ভাবেনিকো! যা মন গেছে লিখে দিয়েছেন। যাই হোক কি আর করবো , ভেবে মেনে নিয়েছিলাম অগত্যা। এবারে আশা করছি একটু ভালো লিখবেন! রিকোয়েস্ট করে নিয়েছি ভালো করে।
সবেবরাতের সাথে আমার ছোট্ট বেলা জড়িয়ে, কি ভালো দিন ছিল! আমার দাদাভাই সবেবরাতের দিন অনেক রকম বাজী আনতেন। সাপ, রসবাতি, রকেট, ফুলঝুড়ি, চড়কি আরো কত্তোরকম। কিন্তু কোনো শব্দবাজী কোনোদিন আনতেন না। আর আনতেন অনেক রকম মোমবাত্তি। আমরা তিন ভাইবোন সকাল থেকে অপেক্ষা করতাম কখন সন্ধে হবে আর আমরা সবাই মিলে বাজী পোড়াবো, মোমবাত্তি জ্বালাবো। আব্বু আনত তুবড়ি। বড়ো, মেজো , ছোটো তুবড়ি।
সন্ধে হলেই সারা বাড়িটা মোমের আলোয় উদ্ভাসিত।লাইট অফ করে দেওয়া হতো। আমাদের পুরোনো বাড়িটার আনাচে কানাচে জমাট অন্ধকারে মোমের আলো মায়াবী, গা ছম্ছমে পরিবেশ সৃষ্টি হতো। কখনো কখনো তীব্র হাওয়া এসে মোমবাতি নিভিয়ে চলে যেতো, আবার প্রথম থেকে জ্বালানো শুরু। মুরুব্বীরা বলেন, আজকের দিনে আল্লাহর কাছ থেকে আমাদের মৃত পূর্বপুরুষগণ ছুটি পান, নিজের নিজের বাড়ি আসেন এটা দেখতে যে তাদের পি্রয়জনরা কেমন আছে। তাই সব্বাই যেন মিলেমিশে থাকে, কোনো ঝগড়াঝাঁটি নয়, রাগারাগি নয়! নইলে তেনারা কষ্ট পাবেন।
বাজী পোড়ানো শুরু। প্রথমে ফুলঝুড়ি, তারপর সাপ, চড়কি... এক্কেবারে লাস্টে তুবড়ি। তুবড়ি আমরা জ্বালাতে পারতাম না, ওটা আব্বুর দায়িত্ব ছিলো। কি সুন্দর হুস করে অ্যাত্তোবড়ো ফোয়ারার মতো ফুলকি। আম্মু বলতো সরে আয়, সরে আয়, গায়ে পড়বে, পুড়ে যাবে। আমরা ভয়ে আনন্দে লাফাতে লাফাতে সরে আসতাম। এবার আমার তুবড়িটা জ্বালাতে হবে বায়না তিন জনেরই। যার টা ভালো আর বেশি উচ্চতায় যেতো সে নিজেকে বিজয়ী ভেবে গর্বিত। কার টা বেশি ভালো জ্বলেছে তা নিয়ে তর্ক। আব্বু-আম্মুকে বিচারক করে উৎসুক তিন জনাই। সব থেকে কঠিন বিচার পিতামাতার, কোন সন্তানকে নিরাশ করবে! শেষে সিদ্ধান্তগ্রহণ করতো তিন জনের তুবড়ি সমান জ্বলেছে। সব্বাই বিজয়ী।
সবেবরাতে আমাদের বাড়িতে গরীব মানুষজনদের আম্মু বিরিয়ানি বা পোলাও রান্না করে বিতরণ করে। একতলার বারান্দায় লাইন করে লোকজন খাবার, টাকা নিয়ে যায়। গোল থামে হেলান দিয়ে দেখতাম আম্মুর ধৈর্য। এক এক করে সবাইকে সমান খাবার দিয়ে যাচ্ছে।
এইদিন আমাদের বাড়িতে চালের আটার রুটি আর নানান রকমের হালুয়া হতো। আমার আম্মু ভীষণ ভালো হালুয়া বানায়, এক কথায় অসাধারণ। পাড়ার লোকজনদের সাথে হালুয়া , রুটি আদানপ্রদান চলতো। হাতে বোনা কুরুশের ফুল তোলা ঝালড় তোলা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে বাড়ি বাড়ি হালুয়া দিয়ে আসতাম আমি আর নিউ। এখন সবাই ব্যস্ত, এই পুরোনো মিষ্টি রেওয়াজ গুলো আস্তেআস্তে লুপ্ত হয়ে আসছে। আজকের সারারাত আম্মু নামাজ পড়বে, দোয়া চাইবে, আম্মুর মতো অনেকেই নামাজ পড়বেন। বাড়িতে বাড়িতে দোয়া চাওয়া হবে, মোমবাতির আলোয় উদ্ভসিত হবে গরীব হতে বড়োলোকের বাড়ি।
আল্লাহ গো আজকে যেন সবার কপাল ভালো লিখো। হালুয়া না হোক পেটে খাবার নসিব যেন হয় এই পৃথিবীর অগুন্তি গরীব মানুষজনদের। নামাজ পড়িনি, নিয়ত্ ভালো রেখে চাইছি। জানি তোমার যতটা সম্ভব তুমি করবে। সবাইকে ভালো রেখো, আর এই মেয়েটার কথা একটু ভেবো।
আমিন।
চারবছর আগে লিখেছিলাম... 😊
এখন বোধহয় এটা আর হাত দিয়ে নামবে না।

পিউয়ের পোষ্যরা ১

হঠাৎ এক চৈত্রমাসের কোনো এক সপ্তাহে দাদাভাই আমাদের দুইবোনকে দুটো টিয়াপাখির ছানা কিনে দিলেন। এই এত্তোটুকুন... তুলোর মতো সাদা সাদা নরম লোম সারা গায়ে... মাঝেসাঝে সবুজ পালক। তখনো পালক গজায়নি পুরোপুরি, গোলাপী চামড়া দৃশ্যমান... চোখ ফুটেছে মাত্র,লাল টুকটুকে ঠোঁট ! পাখিওলা রাস্তা দিয়ে পাখি নিয়ে যাচ্ছিলো... তা দেখে আমার বায়না পাখি কিনবো।
মায়ের কোল থেকে পাখিওলা তুলে এনেছে দুটো পয়সার লোভে। আহা রে জীবন... দুটো পয়সার জন্য কত কি করতে হয় মানুষকে।
বাচ্চা দুটো খেতে পারে না নিজে নিজে... পাখিওলা বললো মুসুর ডাল ভিজিয়ে খাওয়াবেন। আমরা তাই করলাম। সেই সময় টুটুদিদিরা এসেছে আমাদের বাড়ি। তাই অনেক লোকজন পুরো বাড়িতে। আত্মীয় স্বজনরা সব দেখা করতে এসেছে। টুটুদিদি আমার বড়োফুফুমণির মেয়ে। জিজু চাকরি করেন এয়ারফোর্সে। এই শক্তপোক্ত চেহারা,শক্তিমান.....বিকানিরে থাকেন। সেই জিজু আমাদের সবার খুব প্রিয়। তিনি বললেন বাচ্চাদুটোর নাম রাখতে হবে তো? কিছু নাম ঠিক করলে তোমরা? আমরা দুই বোন বললাম আপনিই ঠিক করুন। উনি নাম রাখলেন মিকি মাউস আর নিকি ন্যাপচুন। আমাদেরও খুব পছন্দ হলো নাম দুটো।
কিছুদিন পরে নিকি ন্যাপচুনের হঠাৎ করেই শরীর খারাপ, খাবার হজম করতে পারছে না। মুসুর ডাল হজম করার ক্ষমতা নেই অতোটুকু বাচ্চাদের। মিকিও অসুস্থ...পয়লা বৈশাখের দিন বাড়িতে বিশাল হৈ চৈ.. বাবুর্চি রান্না করছে । এমন সময় নিকি ন্যাপচুন মরে গেলো। আমার সে কি বুক ফাটা কান্না। খুব কেঁদেছিলাম... আমার বুকের ভিতরটা যেন ছিঁড়ে নিয়েছিলো কেউ.. আম্মু দাদাভাই সবাই সান্ত্বনা দিচ্ছে!
আত্মীয় স্বজনরা বুঝতে পারছে না একটা সামান্য পাখির জন্য কেন এতো কান্নাকাটি... এদিকে মিকিও অসুস্থ... মুসুর ডাল হজমের ক্ষমতা তার নেই।
শেষে ড্রপে করে তাকে দুধ খাওয়াতে শুরু করলাম। কদিন পরে আমার মিকি সুস্থ হলো। তার পালক গজানো শুরু হলো... মিকি আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। মা ভাবে কিনা জানিনা... কিন্তু সে আমার ঘাড়ে, মাথায় চড়ে ঘুরে বেড়ায়। খাঁচায় থাকার কোনো শখ তার নেই।
এদিকে বাড়িতে অনেক বেড়াল। সামনে ইয়াদের বাড়িতে অনেক বিড়াল আছে। তারা আমাদের বাড়ি এসে বসে থাকে। ডাস্টবিন উল্টিয়ে মাছের কাঁটা খায়।
অগত্যা মিকিকে খাঁচায় রাখতে হবেই... মিকি থাকবে কেন?
সে ঠোঁটে করে খাঁচার শিক বেঁকিয়ে বেরিয়ে যায়! কিছুতে তাকে বাগে আনা যায়না। আম্মু দাদি দুজনেই বলে যেমন মনিব, তেমন তার পাখি! দুটোই গেছো এবং বদমাশ!
এমন করে বেড়োতে গিয়ে হঠাৎ একদিন মিকির একটা পাখায় আঘাত লেগে হাড় সরে গেলো। সে চেষ্টা করলেও আর সারেনি। মিকি আর ভালো উড়তে শিখতে পারলো না । অল্প বিস্তর কাজ চালানোর মতো উড়তে পারে।
সেই মিকি প্রথম কথা শিখলো "এ পিউ"
আমাকে মনে পরলে কিংবা দেখতে পেলেই সুর করে ডাকে "এ পিউ... মিক মিক মিকি।" মানে এ পিউ, মিকি তোকে ডাকছে।
কখনো শিষ দিয়ে বলে "এ পিউ... মিক মিক মিকি।"
কোনো অপরিচিত এলে চীৎকার "কে কে কে?"
কোনো অপরিচিত মানুষ বাড়িতে এসে বাড়ির কোনো কিছুতে হাত দিলে চীৎকার করে পাড়া মাত করে।
আমি যখন হারমোনিয়ামে রেওয়াজ করি আমার সঙ্গে সুর করে
গায় "আয় তবে সহচরী।"
আম্মু আমাকে মারলে বা বকলে মিকি জোরে জোরে আম্মুকে বকে দেয়। আমার ক্ষেত্রে মিকি সাংঘাতিক রক্ষণশীল। সে কাউকে বকতে দেবে না, মারতে দেবে না। আমার উপর একমাত্র তার অধিকার।
আমাকে সে কামড়ায়না, আঁচড়ায়না। বাকিদের কামড়ে আঁচড়ে রক্ত বের করে দেয়! দাদি খেতে দিতে গিয়ে কামড় খেয়ে বলতেন "বদ পাখি কোথাকার, আর খেতে দেবো না! "
মিকি চোখ পাকিয়ে আবার ঠুকরে দেয়। মিকি আমার সর্বস্ব, সে আমার জান।
আব্বু মজা করে মিকিকে নাতি ডাকে... আর বলে শ্বশুড়বাড়ি গেলে মিকিকে আমার সঙ্গে দেবে!
(চলবে)

দুনিয়ার সব শাহরুখ ভক্তরা এক হও

আজকে তৌসিফের এক কলিগের ফেয়ারওয়েল ছিলো। লোকটি চীন দেশের লোক, নাম ইয়াং।
ইয়াং ফিজিক্সের একজন ভালো গবেষক এবং খুব ভালো ছবি তোলে। চীন সরকার ইয়াংকে মোটা টাকা মাইনে দিয়ে প্রফেসর পদ অফার করেছে । তিরিশ শতাংশ মূল্য দিয়ে বাড়ি কেনা এবং অন্যান্য অনেক সুযোগ সুবিধা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, তাকে পর্যাপ্ত ছুটি এবং বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ভিজিটের জন্যও ফান্ডিং করবে বলেছে। মোট কথা, খুবই ভালো অফার। ইয়াং এর তাই মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে চীনে চলে যাচ্ছে।
সেই ইয়াং আজকে পার্টি দিয়েছিলো একটা গ্রীক রেঁস্তোরায়। যার যা ইচ্ছা খাবার অর্ডার... সবাই ওর অফিসের এবং গ্রুপের লোক.. একমাত্র আমিই বহিরাগত এবং অবশ্যই পদার্থবিদ নই।
আমার সাথে তৌসিফের প্রায় সব কলিগের পরিচয় আছে এবং যথারীতি গাছের আম থেকে অ্যামাজনের পোকা সব নিয়েই আলোচনা হয়। তৌসিফ চুপচাপ শোনে... নতুন লোকে ভাবতে পারে যে এরা আমারই কলিগ.. তৌসিফ নিমন্ত্রিত। ভাবাটা মোটেই আশ্চর্যজনক হবে না।
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ডাইরেক্টর তথা তৌসিফের জার্মান হোস্টকে আজকে খেজুর গুড় এবং ছানা তৈরীর পদ্ধতি নিয়ে জ্ঞান বিতরণ করেছি... তিনি গুড় এবং বাঙালী মিষ্টির বিবরণ শুনে সাংঘাতিক ইমপ্রেসড। ভারত যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ অবধি প্রকাশ করেছেন। তৌসিফের অস্ট্রিয়ান কলিগ খেজুর রসের মদ খেতে সাংঘাতিক ইন্টারেস্টেড হয়েছে।
তো আলোচনায় ফা-হিয়েন, হিউ এন সাঙ থেকে আরম্ভ করে তৈমুর লং, মেগাস্থিনিস হয়ে দলাই লামা , বুদ্ধ (ভট্টাচার্য্য নয়) সবই এসেছে।
চীনের মাইথোলজি, অস্ট্রিয়ার রাজনীতি, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট, ইউরোপের রিফিউজি সমস্যা সবই আলোচ্য বিষয় ছিলো।
মোদ্দা কথা লাদাখের দুই কুঁজওলা উট থেকে আরম্ভ করে মিশরের নীলনদ সব নিয়েই গুরু গম্ভীর আলোচনা হয়েছে।
তবে অবশ্যই ফিজিক্স বাদ... আমি থাকতে ফিজিক্স নিয়ে আলোচনা কখনোই হতে পারে না!
এমন অবস্থায় আর একজন চীনা হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলো আমি দেবদাস দেখেছি না! ব্যস... আবার কি! গুরু চলে এসেছে আলোচনায়..দেবদাস নিয়ে ছোকরা সাংঘাতিক ইমপ্রেসড। সে আবার শাহরুখ খানের তুমুল ভক্ত। তার উদ্দীপনা দেখে অস্ট্রিয়ান ছেলেটা সিনেমার নাম লিখে নিলো যাতে সে পরে সিনেমাটা দেখতে পারে! এই সুযোগে টুক করে আমি শরৎচন্দ্র এবং বাংলার সাহিত্য নিয়ে পাঁচ মিনিটের টক দিয়ে দিলাম।
এইভাবেই আমরা একদিন চীন এবং বাকি দেশের সাথে যুদ্ধ মেটাবো ইনসাল্লাহ!
শাহরুখ খানের ভক্তরা মিলে সব যুদ্ধ, বিগ্রহ , রাগারাগি মিটিয়ে বিপ্লব আনবো দেশে দেশে!
কোনো এক পুণ্য প্রাতেঃ দুনিয়ার সব শাহরুখ ভক্তরা এক হও স্লোগানে মুখরিত হবে পৃথিবীর প্রতিটি কোণ।
শাহরুখ দীর্ঘজীবি হোক। 😍
ও হ্যাঁ, চীনে যেতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইয়াং। আমি তাকে আশ্বস্ত করেছি তৌসিফ অবশ্যই চীনে যাবে.. না গেলে আমি ঘাড় ধরে তৌসিফকে বিশ্ববিদ্যালয়ে টক দেওয়াতে নিয়ে যাবো.. আর সেই সুযোগে টুক করে চীন দেশ ঘুরে নেবো। 🤪

Friday, 21 December 2018

মোনালিসার জন্মদিনে

তখন বর্ধমানে অনেক শীত পড়তো। ডিসেম্বরে ছাদে সবাই রোদ পোহাতো...এরকমই একটা দিনে অ্যাপোলো হাসপাতালে ও জন্মেছিলো। এতটুকু বিড়াল বাচ্চার সাইজের... মাথার পিছনে একটা আলু... কিভাবে ঐরকম আলু হয়েছিলো কেউ জানেনা। হয়তো পেটে থাকতে কোনোভাবে আঘাত পেয়ে গেছিলো। পজিশন খারাপ থাকায় সময়ের আগেই সিজারিয়ান করতে হয়েছিলো।
হাসপাতালের ছাদে শীতের নরম রোদে বাচ্চাদের দোলনায় সারি সারি বাচ্চা... দাদি এসেছেন নতুন জন্মানো নাতনীকে দেখতে।
হাসপাতালের আয়ারা মজা করে দাদিকে বললেন কোনটা নাতনী বলুন দেখি। দাদি সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন অন্তত দশ পনেরোটা বাচ্চা শুয়ে। আয়াদের বললেন ঐ কোণের সবথেকে ধবধবে সাদা বাচ্চাটা আমার নাতনী।
দুধে আলতা রং... টিকালো নাক, পাতলা ঠোঁট.. গভীর পাপড়িওলা চোখের মেয়েটা বরাবরই রোগা... শুশুক প্রকৃতির। কেউ জোরে কথা বললেও ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেলবে মনে হয়।
আমি তখন দেড় বছরের বাচ্চা... তারপরেও কোনোভাবে ঝাপসা দৃশ্যটা মাথায় আটকে গেছে। আম্মু হাসপাতাল থেকে রিক্সায় বাড়ি ফিরছে.. কোলে হলুদ জামা পরা পুতুলটা।
এই পুতুলটাকে আমি ভাই বলতাম কারণ আমার ভাইয়ের শখ ছিলো অনেক...ওর দোলনায় উঠে বসে থাকতাম। আম্মু সর্বদা নজরে রাখতো ভাই ভাই করার আতিশয্যে বাচ্চার ক্ষতি না হয়ে যায়।
ছোটোবেলায় যারাই বাড়িতে আসতো আম্মুকে বলতো তোমার এই ছোটো মেয়েটা এত্ত সুন্দর... পরীর মতো সুন্দর। আমার ভীষণ রাগ হতো... আমারই বোন আর আমার থেকেও সুন্দর কি করে হয়?
বড়ো হওয়ার সুবাদে সব জিনিষে আমার অধিকার ছিলো প্রথমে, তারপরে নিউয়ের... সে স্কুলের বই থেকে আরম্ভ করে নতুন সোয়েটার। তারপর আমার দরকার মিটে গেলে সেটা নিউ পেতো। ছোটোবেলায় আমি বড্ড হিংসুটে ছিলাম। আমার সবথেকে ভালো জিনিষটাই চাই... আর ঐ সুন্দর পুতুলের মতো মেয়েটা প্রায় সব জিনিষই পেতো আমার ব্যবহার করা।
প্রথমবার যখন আবৃত্তি কমপিটিশনে ও প্রথম হয়ে গেলো, আর আমি দ্বিতীয় ...আমি হাত পা ছড়িয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদেছিলাম। আম্মুকে বলেছিলাম তুমি ওকে বেশী ভালোবাসো তাই ওকে বেশী ভালো করে শিখিয়েছো।
নিউ প্রচন্ড পরিশ্রমী। সবকাজেই অনেক পরিশ্রম করে... যখন প্রথম গান শিখতে শুরু করে হাতটা হারমোনিয়ামের বেলো অবধি পৌঁছাতো না। আম্মু ওকে দুটো বালিশের উপরে বসিয়ে দিতো... ঐ টুকু মেয়ে ভোরবেলায় উঠে রেওয়াজ করতো প্রতিদিন। আর তখন হাত পা ছড়িয়ে আমি ঘুমাতাম।
আঁকা থেকে আরম্ভ করে পড়াশোনা সবকিছুই মেয়েটা যত্ন নিয়ে অভ্যাস করতো...এদিকে তখন আমি পড়াশোনা না করার জন্য ঠ্যাঙানি খাচ্ছি। আম্মু বরাবর বলতো ছোটো বোনকে দেখেও তো শিখতে পারিস... নিউকে কখনো কিছু বলতে হয়নি। আমার ঠ্যাঙানি দেখেই ও শিখে যেতো ওকে কি করতে হবে। কখনো মার খায়নি.. সবার চোখের মণি, বাধ্য, শান্ত, সবার হুকুমে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ে , তবু মুখে টুঁ শব্দটা নেই।
সেখানে আমি হলাম অবাধ্য, হাড় বজ্জাত , মুখে মুখে তর্ক করা বেতমিজ একটা মেয়ে...
পুতুলটা যত বড়ো হতে লাগলো আরো সুন্দর হতে শুধু করলো.. মধুবালার মতো ঠোঁটের নীচে তিল, হাসির মাঝে গজদন্ত... ঈশ্বর যেন বড়ো যত্ন করে বানিয়েছে!
নিউয়ের উপর অধিকার চাপানো আমার স্বভাব ছিলো। ওটা আমার বোন... অতএব আমার মতো করেই চলতে হবে এইরকম একটা ব্যাপার। ভীতু, শান্ত মেয়েটাকে কেউ কিছু বললে আমার ঝগড়া করতে মন হতো। মনে হতো মেরেই দেবো আজকে... কি সাহস, আমার বোনের দিকে নজর দেয়!!!
তারপরেও কেমন করে যেন ভীতু মেয়েটা বড়ো হয়ে গেলো... সেই মেয়েটা যে বুড়ি ফুলওয়ালীর কাছ থেকে সবফুল কিনে বাড়ি চলে আসে... সেই মেয়েটা যে রাস্তার খালি পায়ের পথশিশুদের দেখে জুতো কিনে বাড়ি দিয়ে আসে... সেই মেয়েটা যে কেরালা বন্যাত্রাণই হোক কিংবা কৃষক মিছিল , তার জন্য অফিসে লাখ লাখ চাঁদা তোলে...
সেই মেয়েটা যে কিনা দারুন সুন্দর আঁকে... যার জুতোর সংখ্যা জয়ললিতার আলমারীকেও লজ্জা দেবে... যে মেয়েটা একশো টাকা দিলে ষাটটাকা জমিয়ে ফেলে, যে কিনা গরীব মানুষদের শীতের সময় একা হাতে কম্বল দান করে... যে মেয়েটা কখনো কাউকে খালি হাতে ফেরায়নি... যার পায়ের তলায় সরষে আছে
আজকে সেই মেয়েটার জন্মদিন... ঐ পুতুলের মতো মেয়েটার জন্মদিন... যে ছোটো হয়েও আমাকে দিদির মতো সামলেছে... যে এখনো আমার দরকার অদরকার খুঁটি নাটি খেয়াল রাখে... যে মেয়েটা প্রায় একা হাতে আমার বিয়ের সমস্ত আয়োজন করেছিলো.. আজ তার জন্মদিন।
জন্মদিনের শুভেচ্ছা মোনালিসা (সুন্দর হাসির জন্য আব্বু আদর করে মোনালিসা নাম দিয়েছিলো)
তার আরো একটা নাম আছে... নিউ সান... নতুন সূর্য।
আমি তোকে এখনো হিংসা করি... একটা মানুষ এতো ভালো কি করে হয়?

জলছবি

১) জুঁইয়ের বাড়ির সামনের দরজায় কে লিখে দিয়ে গেছে “আই লাভ ইউ জুঁই।”
এসব দেখে কাকু ভীষণ খেপে গেছে... ওপাড়ায় গিয়ে পলাশকে চমকে এসেছে... মনে হয় পলাশই এই কাজটি করেছে।
রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যাচ্ছে কৈশোরের ভালোবাসা।
২) আব্বুর দাঁত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। টেবিলের উপরেই রাখা ছিলো। তারপরেই দেখছে আর নেই। বেশ ছোটো বেলায় পোকা হওয়ায় কটা দাঁত তুলে দিতে হয়েছিলো। 
আম্মু অনেক গোয়েন্দাগিরি করে বের করেছে আসল কালপ্রিটকে। আম্মুর ধারণা খামারে থাকা মেঠো ইঁদুরের কীর্তি এটা। ধানের সময়ে খামারে ইঁদুরের উৎপাত থাকে ভালোই।
আম্মু প্রফুল্লচিত্তে তেনার এই গোয়েন্দাগিরির কথা আমাদেরকে বলাতে আব্বু ভীষণ রেগে গেছে। ইঁদুরের এই ভয়ানক সাহস আব্বুর একদমই পছন্দ হয়নি।
নিউ আব্বুকে আবার বলেছে ‘আব্বু ছোটো বেলায় দুধদাঁত ইঁদুরকে দিয়ে বলেনি “ইঁদুর তোমার দাঁত আমাকে দাও.. আমার দাঁত তুমি নাও।”
তাই এতদিন পরে ইঁদুর রেগে গিয়ে আব্বুর দাঁত নিয়ে চলে গেছে।’ এইটা শুনে আব্বু আরো রেগে গেছে।
৩) মৃদুলভাই আজকে খুব রেগে। এত ঘটা করে প্রপোজ করার পরেও রিজেক্ট খেয়েছে। সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভীষণ রাগে কচমচ করে পাতা সুদ্ধ লাল গোলাপটা খেয়ে ফেললো।
আমি , নিউ , ছোটোমামা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে। এইসময় খিল্লি করা উচিত কিনা সেটা নিয়ে ছোটোমামা ভাবছে।
৪) ছোটোমামার পকেট থেকে আম্মু লাইটার খুঁজে পেয়েছে। মামার খবর আছে আজকে... আমরা চার ভাইবোন ঘুরছি ফিরছি আর আম্মুর মতিগতি বোঝার চেষ্টা করছি।
৫) গোলামবাবুর ব্যাচে ঢুকতেই ব্যাচমেটরা সেলিম সেলিম করে চেঁচিয়ে উঠলো।
রাগে দুকান লাল হয়ে গেছে আমার। স্থিতু হয়ে স্যারের পাশে বসতেই আবার সেলিম সেলিম চীৎকার। রেগে গিয়ে সামনের রাখা জলভর্তি বোতলটা ছুঁড়ে মারলাম ওদের দিকে।
গোলামবাবু মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে.. আহা রাগ করে না পিউ, ঠান্ডা হ। চল ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র টা দেখা যাক আজকে।
৬) আজ সকাল আটটার সময়ে নিউ আর সারমিনকে আব্বু নীলপুরে সাইকেল করে ঘুরতে দেখেছে। আব্বুর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে না ঠিক আব্বু রেগে আছে কি নেই... খাবার টেবিলে আব্বু জিজ্ঞাসা করলো ফুলের দোকানের সামনে কি করছিলো নিউ।
কাঁচুমাঁচু মুখে নিউ উত্তর দিলো ভ্যালেন্টাইনসডে তে দিদিমণির জন্য ফুল কিনছিলো। আব্বুর দিকে তাকানোর আর সাহস হচ্ছেনা কারোরই...আব্বু বিরক্ত হয়ে বোধহয় ভাবছে এসব ভ্যালেনটাইনস ডেই বা কি... আর তাতে দিদিমণিকে ফুলই বা দিতে হবে কেন!
টুকরো টুকরো স্মৃতি... আহা... যখনি পিছন ঘুরে তাকাই একরাশ হাসি কান্না প্রেম রাগ মারামারি মিশ্রিত জলছবি দেখি... ভালোবাসার জীবন.. হ্যারি পটারের অ্যালবামের ছবির মতো মুহূর্তরা নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে মনের মণিকোঠায়।
স্মৃতি সততই সুখের...

Friday, 14 December 2018

জার্মানী ডাইরী-১

পরবাস পর্ব:
অদ্ভুত একটা দেশে এসে পড়েছি! এদেশের আকাশ সবসময় মেঘাচ্ছন্ন.. সূর্য ওঠেই না বললে চলে! হয় বৃষ্টি নয়তো বরফ!!
বর্ষাকাল আমার খুবই প্রিয়.. আমি তো বর্ষার মেয়ে, তাই বৃষ্টির সাথে আমার খুব আপন সম্পর্ক। কিন্তু এদেশের বৃষ্টিটাও বাজে! এরা অতি সন্তর্পণে ঝরবে! কেন রে বাবা! ঝমঝমিয়ে নাম না একবার!! তা নয়, টিপ টিপ করে পড়ছে। যেন একটু বেশি জোরে বৃষ্টি হলেই মাস্টারমশাই খুব বকে দেবে!
কলকাতায় অফিস যাওয়ার সময় খুব চাইতাম একটু মেঘ করুক, সেইসময় আমি অফিস পৌঁছে যাই টুক করে! আর এখানে চাইছি সূর্য উঠুক অন্তত আজকে! অনন্ত অপেক্ষা তবু সূর্য উঠছে না! সেই কবে ভারতবর্ষে সূর্যের মুখ দেখেছিলাম!
গতকাল গোটা বিশ্বে উল্কাপাত হলো, সবাই দেখলো আমি বাদে!
মেঘাচ্ছন্ন মাইন্জ!
আমার দেশের পেঁয়াজের রংটাও কি সুন্দর...কথাতেই আছে পেঁয়াজী রং! ও বাবা! এ দেশের পেঁয়াজ তো সবুজ!!!!
এতো সবুজের বহর দেখলে আমাদের দিদি ভারী খুশি হতো!
কি ভাগ্যিস গাজরের রংও সবুজ নয়!
এখানে আমি লঙ্কা অবধি মিস করছি... কারণ এরা লঙ্কা খায়না!
যদিও আমার মিস করার তালিকাটা বেশ দীর্ঘ!
সূর্য, পেঁয়াজ,চড়ুই, ফুচকা, বাসের কন্ডাক্টারের চীৎকার, অটোর লাইন, লাল পতাকার বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক স্লোগান, কাকের কা কা এমনকি মমতা ব্যানার্জ্জীকেও!!!
এমন হতচ্ছাড়া দেশ, কাক অবধি চীৎকার করে না!
হোয়াই ম্যান? হোয়াই? হোয়াই?
পায়রা আছে অনেক, সেগুলো খেয়ে খেয়ে এত্তো মোটা হয়ে গেছে! তাদের উড়তেও আলিস্যি! এক হাত উঁচু গাছে বাসা করে বসে আছে এবং অবশ্যই নো বক বকম!
মাঝেমধ্যেই প্যানপ্যান করছি এ ক্যামন দেশরে বাবা! সূর্য নেই, কাক নেই, মানুষের চীৎকার নেই! তবে আছে টা কি!!!!!
কদিন আগে ক্রীসমাস পার্টিতে গেলাম। হাই এনার্জী পার্টিকল ডিপার্টমেন্টের পার্টি! তা সেখানে সবাই বিশেষ জ্ঞানী!
চুনোপুঁটি বিজ্ঞানী থেকে আরম্ভ করে হাইফাই বিজ্ঞানী সবরকমই আছেন সেই পার্টিতে!
সেই পার্টি এমন ....কি আর বলবো! লোকে ফিসফিস করে কথা বলছে! যেন হাসপাতালে এসেছি কিংবা সদ্য সদ্য কেউ মারা গেছে! ইনফ্যাক্ট আমাদের দেশে লোক মারা গেলেও এর থেকে বেশি হৈ চৈ হয়! লোকজন চুপচাপ খেলো... তিনচারজন গিটার, পিয়ানো আর ভায়োলিন বাজালো ব্যস!!!
আমি ভাবলাম আমিই উঠে দুটো রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে দিই!
একি রে বাবা! এটা পার্টি!!! কাঁটা চামচ ছুরির টুংটাং আওয়াজ ছাড়া কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না!
সাড়ে আটটায় সকাল হয়ে চারটেই সন্ধ্যে! আমি ঘুম থেকে উঠতে না উঠতে দিন শেষ!
জানালা দিয়ে তাকাবো কি! শুধুই বৃষ্টি! কাঁহাতক আর “শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে” গাওয়া যায়!!!
সবথেকে অসুবিধা হলো কথা বলা! এরা ইংরাজী বোঝে না, বলেও না! এ এক মহা জ্বালা! কথা না বলে বলে পেট ফেঁপে যাচ্ছে!
সূর্য নেই, কাক নেই, চড়ুই নেই...গাড়ির হর্ণ নেই!
নিস্তব্ধ চরাচর... টিপটিপ পা টিপে চলা বৃষ্টির দেশ।

Monday, 7 November 2016

শৈশবের গন্ধ মাখানো শৈশব

আমি বরাবরেই ফাঁকিবাজ ছাত্রী। যাকে বলে সিরিয়াস টাইপ ফাঁকিবাজ। তবে ইস্কুলে পড়াটড়া করে যেতাম, মানে ঐ টুকুই পড়াশোনা করতাম আরকি যেটুকু না হলেই নয়। বাড়িতে আম্মু বাঁদর মেয়ে বলতো আর ইস্কুলে দিদিমণিরা বেশ লক্ষী মেয়ে বলতেন। আমাদের ইস্কুলে দুজন ক্লাস মনিটর থাকতো। তারা অফপিরিয়ডে দায়িত্ব নিয়ে আমাদের চুপ করিয়ে রাখতো যাতে আমাদের মাছের বাজারের কারণে বাকি ক্লাসের ডিসটার্ব না হয়। যারা কথা বলতো তাদের নাম বোর্ডে লেখা হতো আর পরের ক্লাসে দিদিমণি এসে তাদের শাস্তি দিতেন। ক্লাস সেভেনে একবার আমার নাম বোর্ডে উঠে গেছিলো, ভৌতবিজ্ঞানের কবিতা দিদিমণি খুব অবাক হয়ে আমাকে বলেছিলেন তুইও কথা বলেছিস? দুষ্টুমি করেছিস?
এইরকমই রেপুটেশন ছিলো। তবে, আমার জিনিষের ব্যাপারে আমি খুব সতর্ক থাকতাম। প্রতিদিন ইস্কুলে গল্পের বই নিয়ে যেতাম আর কাউকে ছুঁতে দিতাম না বলে অনেকে হিংসুটে বলতো। সে আমি এখনো কাউকে বই দিইনা। বই দিলে সে বই যত্ন না করে ছিঁড়ে ফেললে আমার খুব রাগ হয়। আমি বইখাতা , আমার রং তুলি, আঁকার খাতা, ডাইরী সবই ভীষণ যত্ন করে রাখতে পছন্দ করি।
সেই মেয়েই বাড়িতে বদমাস বলে পরিচিত ছিলো। এমনটা নয় যে আমি জিনিষপত্র ভাঙতাম বা ওলঢোল করতাম, তবু জানি না কেন আম্মু আমাকে হাড় জ্বালানে বলে!!! এই নিয়ে ভারী দুঃখ আমার।
আমি আসলে এতোই বই পড়তাম যে পরীক্ষার কথাও মাথায় থাকতো না। পড়ার বইয়ের ফাঁকে গল্পের বই পড়াতে আমার জুড়ি ছিলো না। পড়তে পড়তে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে এই ত্রিভুবন ত্যাগ করে যেই ক্লাইমেক্সে পৌঁছতাম , অমনি আম্মু কান ধরে বইটা কেড়ে সামনে রসকষহীন পড়ার বই ধরিয়ে দিতো! সমস্যা হলো পড়ার বই পড়তে আমার কোনোদিনই ভালো লাগেনি....!!! যেই ক্লাসটা পেরিয়ে যেতো ঐ ক্লাসের বইগুলো পড়তে ভালো লাগতো। যেমন, ইতিহাস কোনোদিন ভালো লাগতো না, এখন সেই মেয়েই ইতিহাসের বই পড়তে খুব ভালোবাসে!
এই মেয়েই কিন্তু দুবছর বয়সে হাসিখুশি, বর্ণপরিচয় পড়তে শিখে গেছিলো! আমার মেজো পিসেমশাই আমার দিকে তাকিয়ে খুব অবাক হয়ে বলতেন ঐটুকু মেয়ে এতো নির্ভুল পড়ছে কি করে? এতো প্রতিভা দেখে আম্মু আব্বু ভেবে নিলো মেয়ে বড়ো হয়ে কেউকেটা একটা হচ্ছেই!
তারপর একটু বড়ো হতেই আঁকা, আবৃত্তি, কুই্যজে পুরস্কার পাওয়াতে তাঁরা আরো সিওর হয়ে গেলেন!
তারপর যতো বড়ো হলো মেয়ে ততই আশা ভরসা চুরচুর করে বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে পাতি ইঞ্জিনীয়ার হয়ে নঘন্টার অফিসের কেরাণীতে পরিণত হলো সেই প্রতিভাময় কন্যা!
যাইহোক, ছোটোবেলাতে যে জিনিষটা আমি অপছন্দ করতাম সেটা কারোর ক্ষমতা ছিলো না আমার মগজে ঢোকানোর!!
নামতা!!! এতই ফাঁকিবাজ ছিলাম যে আটের ঘরের নামতার বেশি মুখস্ত করিনি! নয়ের ঘরেরটা তো এক থেকে আট মুখস্ত করলেই হয়ে যায়! আর বাকি গুণ করে বসাতাম! আম্মু শত চেষ্টা করেও মুখস্ত করাতে পারেনি! 😂😂
আর একটা জিনিষ আমি অপছন্দ করতাম, তা হলো ইংরাজী! অসহ্য লাগে! এর ফলশ্রুতি আমি ইংরাজীতে বেশ কাঁচা!!! 😂😂😂
আমার পছন্দ কি ছিলো জানো? পুতুলখেলা!
আমার দশ বারোটা পুতুল ছিলো.... এখনো আছে। নীল চোখের চোখ পিটপিট পুতুল। না , বার্বি নয়। ক্লাস টেনের জন্মদিনে আম্মু প্রথম বার্বি উপহার দেয়, সাদা পোষাক পরা খ্রীশ্চান নববধূ। আমার পুতুলের নামও ছিলো.... কেটি, অ্যালিস, হাইডি, রাহুল, এলিস , রাইন ইত্যাদি ।
আমার খেলনা বাটিও ছিলো কত রকমের, প্লাস্টিকের, তামার, স্টিললের , মাটির !!! চামচ সেট, গ্যাস ওভেন, থালা, গ্লাস আরো কতকি। আম্মু কাঠের মিস্ত্রি দিয়ে পুতুলের ড্রেসিং টেবিল, খাট কতকি বানিয়ে দিয়েছিলো। আমি পুতুলের জামা বানাতে ভালোবাসতাম। বর্ধমান শহরের যত নামি দর্জি আছে তাদের কাছে গিয়ে গিয়ে বেঁচে যাওয়া কাপড়ের টুকরো এনে সুন্দর সুন্দর পোষাক বানাতাম। হাতে সেলাই করে। আমার একটা খাতা ছিলো যাতে আমি পোষাক ডিজাইন করতাম। তারপর, সেলাই করে জামা বানাতাম! আমার অনেক ইচ্ছের মধ্যে একটা ইচ্ছে ছিলো ফ্যাশন ডিজাইনার হবো।
তারপর যা হয় আরকি! ছোটোবেলার অগণিত স্বপ্নগুলো স্বপ্ন হয়েই ঘুরে বেড়ায় আমাদের মধ্যে! পৃথিবীতে কিছু ইচ্ছে পূর্ণ না হওয়া বড্ডো দরকার, তবেই না আমরা বেঁচে থাকার রশদ পাবো। এখনো আমার কেটি, অ্যালিসরা আছে, বড়ো একটা সিন্দুকের মধ্যে। আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কালের ক্রমে। আর আমার বুকের ভিতরটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যায় একটু একটু করে। আমার শৈশব লুকিয়ে আছে ঐ পুতুল, গল্পের বই, ছোটোবেলার ছবি আর আম্মুর মুখের গল্পে। আমি অনুভব করি একটু একটু করে, প্রাণ ভরে বাঁচি ঐ সময়টাতে এখনো।
আস্তে আস্তে আমার শৈশবের গন্ধ মাখানো সব জিনিষ নষ্ট হয়ে যাবে, শুধুমাত্র আমি থাকবো.... তারপর আমিও একদিন স্মৃতি হয়ে যাবো। এটাই নিয়ম জগতের.....
আমি শুধু আমার মেয়েকে ঐ নীল চোখ ওলা চোখ পিটপিট পুতুল আর গল্পের বই দিয়ে যাবো একরাশ। যাতে সে আমারি মতো একরাশ স্মৃতি বানিয়ে যেতে পারে নিজের জন্য, অন্যের জন্য।

ডাক্তারবাবু এবং আমি

কদিন ধরেই শরীরটা খারাপ যাচ্ছে। গত সপ্তাহে অফিসে পাঁচ মিনিটের জন্য ধরাধাম ত্যাগ করেছিলাম। সে যাইহোক, ডাক্তারের কাছে গেছি। ডাক্তারবাবু সাংঘাতিক মজার লোক। লাস্টবার যখন গেছিলাম, তখন পোষ্ট ব্রেক আপ সমস্যা চলছিলো। ডাক্তারবাবু আমাকে তাঁর জীবনের ল্যাং খাওয়ার গল্প শুনিয়েছিলেন... যে যাত্রায় ওনার ওষুধ আর ল্যাং খাওয়ার গল্পের সৌজন্যে ট্রমা থেকে বের হয়েছিলাম!!!
এবার, যাওয়ার পরেই উনি জিজ্ঞাসা করলেন সমস্যা কি?
আমি বলার আগেই আমার আম্মু যাবতীয় অভিযোগের ঝুলি নিয়ে বসলেন...
আমি খুব কনফিউজড হয়ে ভাবছিলুম ডাক্তারের কাছে এসেছি নাকি টিচারের কাছে!!!
নেহাৎ ওনার কাছে ডান্ডা ফান্ডা নেই, নইলে আমি সিওর আম্মু ওনাকে রিকুয়েষ্ট করতেন বেশ কয়েক ঘা বসাতে!!
এতো বড়ো ধেড়ে একটি মেয়ের সম্পর্কে যে অ্যাতো অভিযোগ থাকতে পারে, সেটা আমার আম্মুকে না দেখলে বিশ্বাস করা বেশ কঠিন!!
"একদম কথা শোনে না, এতো রাগ মেয়ের ! আপনি কিছু করুন!"
আমি বুঝলাম না আমি কথা শুনি না বা রাগ করি এতে ডাক্তার বাবুর করণীয় কি!!!
বেশ জ্বালায় পরা গেলো তো!
আমি এবার থাকতে না পেরে বলে উঠলাম "আচ্ছা মুসকিল তো!!! তুমি চুপ করবে একটু?
ডাক্তারবাবু আপনিই বলুন এতো বড়ো একটা মেয়ের সব ব্যাপারে নাক গলালে মাথা গরম হবে না? অফিসের ফোন এলেও ওনাকে বলতে হবে কে ফোন করেছে , কি বললো!!!
কিছু বললেই বলবে 'আমি তোর মা, আমার অধিকার সবথেকে বেশি!! আমি জানবো না তো কে জানবে' ! মাথা গরম হওয়াটা কি স্বাভাবিক নয়?"
ডাক্তারবাবু বলে উঠলেন "সত্যিই তো কতো বড়ো হয়ে গেছে! নাক না গলালেই কি নয়?"
আমি ভাবলাম, যাক বাবা আমার হয়েই কথা বলছে!!!
ওমা, সে গুড়ে বালি.... তিনি সংযোজন করলেন " এখনকার জেনারেশনটাই হলো ডিফেক্টিভ, নিজেরাও কাঁদবে অন্যকেও কাঁদাবে!! পুরো জেনারেশনটাই ডিফেক্টিভ জন্ম নিয়েছে।
শোনো মা বাবার কাছে সন্তান কখনো বড়ো হয়না! তুমি যখন মা হবে বুঝতে পারবে!"

বাপ মা হলেই এই বিখ্যাত কথার পেটেন্ট পাওয়া যায় "মা/বাপ হও , তখন বুঝবে!"
বেগতিক দেখে চুপ করে গেলুম। পৃথিবীর সব মা, বাপ একজোট হয়ে যায় সন্তানের বদনাম করার ব্যাপারে! এখন যদি কিছু বলি বলা তো যায় না ইঞ্জেকশন ফুটিয়ে দিলো! আমি আবার ভীষণ ভয় পাই। এদের বিশ্বাস নেই, ছেলেপুলেদের টাইট দেওয়ার ব্যাপারে সব সমান!!
থার্মোমিটারে টেম্পারেচার দেখে , পেট টেপে টুপে, অ্যাঁ করে বের করা জিভ খানিক দেখে শুনে বললেন জ্বর আছে, প্রেশারটাও বেশ লো আছে। সর্দিও আছে.... ভাইরাল মনে হচ্ছে। জল খায়না তাই না?
আমি তো পুরোই কোণঠাসা!!! মোক্ষম জায়গাতে মেরেছে ডাক্তার!!!
এবার আম্মুর চীৎকার আরো বেড়ে গেলো। ডাক্তারবাবু একদম পানি খায়না!! খাবারও খায়না! নইলে এই বয়সে লো প্রেশার হয়?আমি পইপই করে বলেছিলাম পানি না খেলে শরীর খারাপ হবে!!!
ব্যাপার হলো পৃথিবীর সব মায়েরা স্বঘোষিত ডাক্তার হয়! এরা সর্দি, কাশি , বমি সবের ডাক্তারিতে সিদ্ধহস্ত!!!
কি আর করা যাবে, চুপ করেই রইলুম! মনে মনে ভাবছি "হর কুত্তেকা দিন আতা হ্যায়"
যাইহোক, পানি না খেলে স্যালাইন দেওয়ার হুমকি দিয়ে ডাক্তারবাবু পাঁচদিন পরে আবার আমার পদধূলি চেয়েছেন ওনার চেম্বারে!
এই কদিন পানি খেতেই হবে, নইলে ডাক্তারবাবু আর আম্মুর ষড়যন্ত্রে স্যালাইন থেকে কেউ আমাকে বাঁচাতে পারবে না!!!

ভালো আছি, ভালো থেকো।

অফিসে লবিতে দাঁড়ানো মেয়েটির চোখ ছলছল। তার সহকর্মীর সাথে গল্প করছে....তার এক প্রিয় মানুষের মৃত্যুর কথা। রবিবার রাতে অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে...মেয়েটির চোখ থেকে ঝরঝর করে জল পরছে...গলায় আকুতি কেন আমার সাথেই কেন?
আমি বড্ডো স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করলাম। কথাটা শুনে কানে হেড ফোন গুঁজে মুখ ফিরিয়ে চলে এলাম। কিছুই বলার ছিলো না....কি বলতাম? সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কিছুই নেই আমার কাছে.....সমবেদনা আমি জানাতে পারিনা...
প্রিয় মানুষের হারানোর বেদনা বুঝি.... শুধু আমি কেন , এই পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ বোঝে।
যে মানুষটাকে চোখের সামনে হাসতে, খেলতে দেখতো.... সে হঠাৎ করে একদিন নেই.... কোথাও নেই....মন খারাপ করলেও কিছু করার নেই... সে এই পৃথিবীর কোথাও নেই। এই কষ্ট অদ্ভূত রকম কষ্ট।
সেই মানুষটা নেই জীবনে... কিন্তু অন্তত সে এই পৃথিবীতে আছে... হাসছে,খেলছে....ভালো আছে।
হোক না, তার সাথে হয়তো কখনো দেখা হবে না...কোনোদিন ফোনের স্ক্রীণে নং ভেসে উঠবে না...কিন্তু তবু তো মনে শান্তি,বেঁচে আছে, ভালো আছে।
অন্তত পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষগুলোর মতো অন্য জগতে চলে যায়নি সে।
গাড়িটা চলছে তীব্র গতিতে নীল সাদা ফ্লাইওভার পেরিয়ে....সাঁই সাঁই করে পেরিয়ে যাচ্ছে প্রিয় কলকাতা। হেডফোনে গান বাজছে ...জানালা দিয়ে দমকা হাওয়া এসে চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে...কাঁচটা তুলে দিলাম।

পৃথিবীটা বড্ড সুন্দর।
ভালোবাসে বা ঘৃণা করে অথবা কিছুই করে না এমন সব মানুষেরা ভালো থাকুক...এই পৃথিবীরই অন্য কোথাও তারা থাকুক...বেঁচে থাকুক।
সময় বদলায়...মানুষের সম্পর্ক গুলো বদলায়...
একটা সময় পরে বুকের খিঁচখিঁচ অনুভবটা কমে যায়.... অতীত হয়ে স্মৃতিগুলোই রয়ে যায়। একটা সময় পরে ঐ স্মৃতিগুলোর উপরে সময়ের ধূলো জমবে.... ঝাপসা হয়ে যাবে পুরোনো অতীত, নতুন অতীতের কাছে।
একদিন হয়তো হাসি মুখে অতীত বর্তমানের সামনে দাঁড়াবে, সেদিন পুরোনো অতীতের গা থেকে সময়ের ধুলো ঝেড়ে আরো একবার অনুভব করবো পুরোনো সময়টাকে।
ভালো আছি, ভালো থেকো।

ইয়ে সাম যবভি আয়েগি তুম হামকো ইয়াদ আয়োগে...

একটি সপ্তদশী কিশোরী কলকাতা শহরে পা রেখেছিলো... প্রিয় জন্মশহরকে ছাড়তে তার প্রচুর কষ্ট হয়েছিলো... কিছুতেই ভালোবেসে উঠতে পারেনি কলকাতাকে।
নোংরা, ঘিঞ্জি , ভীড়ে ঠাসা কলকাতা তার শহর কখনোই নয়, কোনোদিন সে মনের এক কোণে কলকাতাকে স্থান দেবে না, কিছুতেই নয়।
তারপর নয় বছর কেটে গেছে...গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল...জীবন থেকে চলে গেছে অনেকটা সময়, মনে হয় যেন কত যুগ আগের কথা। পিছনে তাকিয়ে দেখতে পাই কত স্মৃতি জমে গেছে ফেলে আসা জীবনের আনাচে কানাচে।
এই নোংরা শহরটা বড্ড আপন হয়ে গেছে.... পুরোনো রাজপথ, নীল সাদা গ্রীলে ঢাকা ফুটপাত, নিয়ন আলো, ভিখারী সবাই আমার ভীষণ প্রিয়।
এত বছরেও কলকাতাকে সেই ভাবে চিনে উঠতে পারিনি, কেন পারিনি তার পিছনেও রয়েছে অনেক স্মৃতি। তার পরেও মেট্রোর প্রতিটা স্টেশনে, চওড়া রাস্তায় আছে কিছু না কিছু মূহুর্ত লুকিয়ে। যখন সেই স্মৃতি বিজড়িত রাস্তায় নামি তারা এসে মনের ভিতর হাঁকডাক করে...
কলেজ স্ট্রীট আমার কেন এই কলকাতার সব মানুষের প্রিয় একটা জায়গা... কফিহাউস, প্যারামাউন্ট, ট্রামলাইন, অটো সব কিছুই বড়ো প্রিয়।
আমি সবসময়ই চাইতাম কলকাতার সব পুরোনো ইতিহাসকে একবার ছুঁতে, একবার অনুভব করতে। পুরোনো কলকাতার পুরোনো বাড়ির ছাত, জানালা , খড়খড়ি, জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া কড়ি বরগা সবকিছুই আমার অসাধারণ লাগে। মনে হয়, আমার যদি এইরকম পুরোনো বড়ো বারান্দাওলা একটা বাড়ি থাকতো? লম্বা ছাত, যে বাড়ির আনাচে কানাচে যার ইতিহাস লুকোনো... যে বাড়ি সাক্ষী থেকেছে স্বাধীনতা আন্দোলনের, নকশাল আন্দোলনের....যারা সাক্ষী প্রচুর ন্যায়-অন্যায় , বিচার-অবিচারের... ! তাহলে একবার ছুঁয়ে দেখতাম , সেই বাড়ির বারান্দায় বা ছাতে দাঁড়িয়ে চোখ বুজে ভাবতাম সেইসব দিনগুলোর কথা যখন ভোর রাতে কলকাতার রাজপথ ধোয়া হতো....টুনটুন বেল বাজিয়ে ট্রাম যেতো...পুরোনো কলকাতা শহর।
দেবরিনা আর আমি হাঁটছি কলেজ স্ট্রীট ধরে.... ফুটপাত শুনশান রবিবারের ছুটির বাজারে।
কলেজ চত্বর ফাঁকা.... পুঁটিরামের দোকানের বিখ্যাত কচুরি দিয়ে শুরু করলাম , তারপর প্যারামাউন্টের ডাব সরবত, কেশর লস্যি , মৌচাকের রসালো মৌচাক মিষ্টি, কেশর পিস্তা সন্দেশ খেয়ে স্মৃতি বিজড়িত কফিহাউস।
এক কোণের টেবিলের কাছে গিয়ে বসলাম দুজনে... কত রকমের লোকজন ... সবাই আলোচনা করছে কতরকম.... কেউ কাব্য, কেউ কবিতা, রাজনীতি কতকি। পাশের টেবিলে একজন বৃদ্ধ বসে এক মনে কিছু লিখছেন...লিখেই চলেছেন... কে জানে উনি কে... হয়তো কোনো কবি কিংবা লেখক...
খানিক পরে উঠে চলে গেলেন, পরণে পাঞ্জাবি আর ঝোলা ব্যাগ।
হঠাৎ পাশের টেবিলে একজনের ফোনে রিং বেজে উঠলো...
"আজীব দাস্তা হে ইয়ে
কাহা শুরু কাহা খতম...
ইয়ে মঞ্জিলে হ্যায় কৌনসি
না ওহ সমঝ সাকে না হাম...."
স্মৃতি কখনো পিছু ছাড়ে না....। কোনো এক ফেব্রুয়ারি মাসে অষ্টাদশী কোনো এক মেয়ের সাথে কোনো এক মানুষের প্রথম দেখা হয়েছিলো এই কফিহাউসেই....তখনো ফোনে রিংটোন বেজেছিলো "আজীব দাস্তা হ্যায় ইয়ে!"
আমি আর দেবরিনা দুজনেই কফি ঠান্ডা করে খাই। দুজনেই স্মৃতির অতলে... চারপাশে হাজার মানুষ দেখছি, তাদের নিয়ে গল্প করছি... পুরনো স্মৃতির মধ্য থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন মূহুর্ত যারা কিছুক্ষণের মধ্যেই নতুন স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে।
স্মৃতি জন্ম নিতেই থাকে প্রতি মূহুর্তে, আর একটু একটু করে আমরা বড়ো হয়ে উঠি...একটা সময় পরে স্মৃতির ভারে ক্লান্ত হয়ে আমরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিই। সেই স্মৃতিরা ইতিহাস হয়ে রয়ে যায় পুরোনো বাড়ি, রাস্তার আনাচে কানাচে।
হেয়ার স্কুল, হিন্দু স্কুল, সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুল, প্রেসিডেন্সি, মেডিক্যাল কলেজ , কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের প্রতিটা রাস্তায় আমরা হাঁটছি। হাল্কা বাতাস বইছে....ইতিউতি লোকের জটলা... হৈ চৈ...
আকাশে এত্তোবড়ো সোনালী একখানা চাঁদ... নিয়ন আলো আর জ্যোৎস্না মিলে মিশে এক হয়ে গেছে।
আমি হাঁটছি তো হাঁটছিই, ইচ্ছে করছে না মূহুর্তটাকে ছাড়তে..সেই কলকাতাকে ঘৃণা করা মেয়েটা আজকে কলকাতাকে বড়ো ভালোবাসে। কলকাতা তাকে অনেক কিছু দিয়েছে ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, ঘৃণা, শিক্ষা, স্মৃতিতে ভরপুর একটা জীবন দিয়েছে।
গভীর রাত নামছে একটু একটু করে, বাড়ি ফিরতে হবে। পিছনে পড়ে আছে ইতিহাস, স্মৃতি , বহুকাল আগের বড়ো বারান্দায় দাঁড়ানো লাল পাড় সাদা শাড়ী পরা কিশোরী কন্যা....একশো বছর আগের কোনো চাঁদনী রাতের মতোই আজকের রাত... জীবন এগিয়ে চলে ইতিহাস রেখে।
গানটা এখনো কানে বাজছে
"ইয়ে সাম যবভি আয়েগি
তুম হামকো ইয়াদ আয়োগে.....!"