Friday, 21 December 2018

মোনালিসার জন্মদিনে

তখন বর্ধমানে অনেক শীত পড়তো। ডিসেম্বরে ছাদে সবাই রোদ পোহাতো...এরকমই একটা দিনে অ্যাপোলো হাসপাতালে ও জন্মেছিলো। এতটুকু বিড়াল বাচ্চার সাইজের... মাথার পিছনে একটা আলু... কিভাবে ঐরকম আলু হয়েছিলো কেউ জানেনা। হয়তো পেটে থাকতে কোনোভাবে আঘাত পেয়ে গেছিলো। পজিশন খারাপ থাকায় সময়ের আগেই সিজারিয়ান করতে হয়েছিলো।
হাসপাতালের ছাদে শীতের নরম রোদে বাচ্চাদের দোলনায় সারি সারি বাচ্চা... দাদি এসেছেন নতুন জন্মানো নাতনীকে দেখতে।
হাসপাতালের আয়ারা মজা করে দাদিকে বললেন কোনটা নাতনী বলুন দেখি। দাদি সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন অন্তত দশ পনেরোটা বাচ্চা শুয়ে। আয়াদের বললেন ঐ কোণের সবথেকে ধবধবে সাদা বাচ্চাটা আমার নাতনী।
দুধে আলতা রং... টিকালো নাক, পাতলা ঠোঁট.. গভীর পাপড়িওলা চোখের মেয়েটা বরাবরই রোগা... শুশুক প্রকৃতির। কেউ জোরে কথা বললেও ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেলবে মনে হয়।
আমি তখন দেড় বছরের বাচ্চা... তারপরেও কোনোভাবে ঝাপসা দৃশ্যটা মাথায় আটকে গেছে। আম্মু হাসপাতাল থেকে রিক্সায় বাড়ি ফিরছে.. কোলে হলুদ জামা পরা পুতুলটা।
এই পুতুলটাকে আমি ভাই বলতাম কারণ আমার ভাইয়ের শখ ছিলো অনেক...ওর দোলনায় উঠে বসে থাকতাম। আম্মু সর্বদা নজরে রাখতো ভাই ভাই করার আতিশয্যে বাচ্চার ক্ষতি না হয়ে যায়।
ছোটোবেলায় যারাই বাড়িতে আসতো আম্মুকে বলতো তোমার এই ছোটো মেয়েটা এত্ত সুন্দর... পরীর মতো সুন্দর। আমার ভীষণ রাগ হতো... আমারই বোন আর আমার থেকেও সুন্দর কি করে হয়?
বড়ো হওয়ার সুবাদে সব জিনিষে আমার অধিকার ছিলো প্রথমে, তারপরে নিউয়ের... সে স্কুলের বই থেকে আরম্ভ করে নতুন সোয়েটার। তারপর আমার দরকার মিটে গেলে সেটা নিউ পেতো। ছোটোবেলায় আমি বড্ড হিংসুটে ছিলাম। আমার সবথেকে ভালো জিনিষটাই চাই... আর ঐ সুন্দর পুতুলের মতো মেয়েটা প্রায় সব জিনিষই পেতো আমার ব্যবহার করা।
প্রথমবার যখন আবৃত্তি কমপিটিশনে ও প্রথম হয়ে গেলো, আর আমি দ্বিতীয় ...আমি হাত পা ছড়িয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদেছিলাম। আম্মুকে বলেছিলাম তুমি ওকে বেশী ভালোবাসো তাই ওকে বেশী ভালো করে শিখিয়েছো।
নিউ প্রচন্ড পরিশ্রমী। সবকাজেই অনেক পরিশ্রম করে... যখন প্রথম গান শিখতে শুরু করে হাতটা হারমোনিয়ামের বেলো অবধি পৌঁছাতো না। আম্মু ওকে দুটো বালিশের উপরে বসিয়ে দিতো... ঐ টুকু মেয়ে ভোরবেলায় উঠে রেওয়াজ করতো প্রতিদিন। আর তখন হাত পা ছড়িয়ে আমি ঘুমাতাম।
আঁকা থেকে আরম্ভ করে পড়াশোনা সবকিছুই মেয়েটা যত্ন নিয়ে অভ্যাস করতো...এদিকে তখন আমি পড়াশোনা না করার জন্য ঠ্যাঙানি খাচ্ছি। আম্মু বরাবর বলতো ছোটো বোনকে দেখেও তো শিখতে পারিস... নিউকে কখনো কিছু বলতে হয়নি। আমার ঠ্যাঙানি দেখেই ও শিখে যেতো ওকে কি করতে হবে। কখনো মার খায়নি.. সবার চোখের মণি, বাধ্য, শান্ত, সবার হুকুমে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ে , তবু মুখে টুঁ শব্দটা নেই।
সেখানে আমি হলাম অবাধ্য, হাড় বজ্জাত , মুখে মুখে তর্ক করা বেতমিজ একটা মেয়ে...
পুতুলটা যত বড়ো হতে লাগলো আরো সুন্দর হতে শুধু করলো.. মধুবালার মতো ঠোঁটের নীচে তিল, হাসির মাঝে গজদন্ত... ঈশ্বর যেন বড়ো যত্ন করে বানিয়েছে!
নিউয়ের উপর অধিকার চাপানো আমার স্বভাব ছিলো। ওটা আমার বোন... অতএব আমার মতো করেই চলতে হবে এইরকম একটা ব্যাপার। ভীতু, শান্ত মেয়েটাকে কেউ কিছু বললে আমার ঝগড়া করতে মন হতো। মনে হতো মেরেই দেবো আজকে... কি সাহস, আমার বোনের দিকে নজর দেয়!!!
তারপরেও কেমন করে যেন ভীতু মেয়েটা বড়ো হয়ে গেলো... সেই মেয়েটা যে বুড়ি ফুলওয়ালীর কাছ থেকে সবফুল কিনে বাড়ি চলে আসে... সেই মেয়েটা যে রাস্তার খালি পায়ের পথশিশুদের দেখে জুতো কিনে বাড়ি দিয়ে আসে... সেই মেয়েটা যে কেরালা বন্যাত্রাণই হোক কিংবা কৃষক মিছিল , তার জন্য অফিসে লাখ লাখ চাঁদা তোলে...
সেই মেয়েটা যে কিনা দারুন সুন্দর আঁকে... যার জুতোর সংখ্যা জয়ললিতার আলমারীকেও লজ্জা দেবে... যে মেয়েটা একশো টাকা দিলে ষাটটাকা জমিয়ে ফেলে, যে কিনা গরীব মানুষদের শীতের সময় একা হাতে কম্বল দান করে... যে মেয়েটা কখনো কাউকে খালি হাতে ফেরায়নি... যার পায়ের তলায় সরষে আছে
আজকে সেই মেয়েটার জন্মদিন... ঐ পুতুলের মতো মেয়েটার জন্মদিন... যে ছোটো হয়েও আমাকে দিদির মতো সামলেছে... যে এখনো আমার দরকার অদরকার খুঁটি নাটি খেয়াল রাখে... যে মেয়েটা প্রায় একা হাতে আমার বিয়ের সমস্ত আয়োজন করেছিলো.. আজ তার জন্মদিন।
জন্মদিনের শুভেচ্ছা মোনালিসা (সুন্দর হাসির জন্য আব্বু আদর করে মোনালিসা নাম দিয়েছিলো)
তার আরো একটা নাম আছে... নিউ সান... নতুন সূর্য।
আমি তোকে এখনো হিংসা করি... একটা মানুষ এতো ভালো কি করে হয়?

জলছবি

১) জুঁইয়ের বাড়ির সামনের দরজায় কে লিখে দিয়ে গেছে “আই লাভ ইউ জুঁই।”
এসব দেখে কাকু ভীষণ খেপে গেছে... ওপাড়ায় গিয়ে পলাশকে চমকে এসেছে... মনে হয় পলাশই এই কাজটি করেছে।
রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যাচ্ছে কৈশোরের ভালোবাসা।
২) আব্বুর দাঁত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। টেবিলের উপরেই রাখা ছিলো। তারপরেই দেখছে আর নেই। বেশ ছোটো বেলায় পোকা হওয়ায় কটা দাঁত তুলে দিতে হয়েছিলো। 
আম্মু অনেক গোয়েন্দাগিরি করে বের করেছে আসল কালপ্রিটকে। আম্মুর ধারণা খামারে থাকা মেঠো ইঁদুরের কীর্তি এটা। ধানের সময়ে খামারে ইঁদুরের উৎপাত থাকে ভালোই।
আম্মু প্রফুল্লচিত্তে তেনার এই গোয়েন্দাগিরির কথা আমাদেরকে বলাতে আব্বু ভীষণ রেগে গেছে। ইঁদুরের এই ভয়ানক সাহস আব্বুর একদমই পছন্দ হয়নি।
নিউ আব্বুকে আবার বলেছে ‘আব্বু ছোটো বেলায় দুধদাঁত ইঁদুরকে দিয়ে বলেনি “ইঁদুর তোমার দাঁত আমাকে দাও.. আমার দাঁত তুমি নাও।”
তাই এতদিন পরে ইঁদুর রেগে গিয়ে আব্বুর দাঁত নিয়ে চলে গেছে।’ এইটা শুনে আব্বু আরো রেগে গেছে।
৩) মৃদুলভাই আজকে খুব রেগে। এত ঘটা করে প্রপোজ করার পরেও রিজেক্ট খেয়েছে। সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভীষণ রাগে কচমচ করে পাতা সুদ্ধ লাল গোলাপটা খেয়ে ফেললো।
আমি , নিউ , ছোটোমামা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে। এইসময় খিল্লি করা উচিত কিনা সেটা নিয়ে ছোটোমামা ভাবছে।
৪) ছোটোমামার পকেট থেকে আম্মু লাইটার খুঁজে পেয়েছে। মামার খবর আছে আজকে... আমরা চার ভাইবোন ঘুরছি ফিরছি আর আম্মুর মতিগতি বোঝার চেষ্টা করছি।
৫) গোলামবাবুর ব্যাচে ঢুকতেই ব্যাচমেটরা সেলিম সেলিম করে চেঁচিয়ে উঠলো।
রাগে দুকান লাল হয়ে গেছে আমার। স্থিতু হয়ে স্যারের পাশে বসতেই আবার সেলিম সেলিম চীৎকার। রেগে গিয়ে সামনের রাখা জলভর্তি বোতলটা ছুঁড়ে মারলাম ওদের দিকে।
গোলামবাবু মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে.. আহা রাগ করে না পিউ, ঠান্ডা হ। চল ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র টা দেখা যাক আজকে।
৬) আজ সকাল আটটার সময়ে নিউ আর সারমিনকে আব্বু নীলপুরে সাইকেল করে ঘুরতে দেখেছে। আব্বুর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে না ঠিক আব্বু রেগে আছে কি নেই... খাবার টেবিলে আব্বু জিজ্ঞাসা করলো ফুলের দোকানের সামনে কি করছিলো নিউ।
কাঁচুমাঁচু মুখে নিউ উত্তর দিলো ভ্যালেন্টাইনসডে তে দিদিমণির জন্য ফুল কিনছিলো। আব্বুর দিকে তাকানোর আর সাহস হচ্ছেনা কারোরই...আব্বু বিরক্ত হয়ে বোধহয় ভাবছে এসব ভ্যালেনটাইনস ডেই বা কি... আর তাতে দিদিমণিকে ফুলই বা দিতে হবে কেন!
টুকরো টুকরো স্মৃতি... আহা... যখনি পিছন ঘুরে তাকাই একরাশ হাসি কান্না প্রেম রাগ মারামারি মিশ্রিত জলছবি দেখি... ভালোবাসার জীবন.. হ্যারি পটারের অ্যালবামের ছবির মতো মুহূর্তরা নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে মনের মণিকোঠায়।
স্মৃতি সততই সুখের...

Friday, 14 December 2018

জার্মানী ডাইরী-১

পরবাস পর্ব:
অদ্ভুত একটা দেশে এসে পড়েছি! এদেশের আকাশ সবসময় মেঘাচ্ছন্ন.. সূর্য ওঠেই না বললে চলে! হয় বৃষ্টি নয়তো বরফ!!
বর্ষাকাল আমার খুবই প্রিয়.. আমি তো বর্ষার মেয়ে, তাই বৃষ্টির সাথে আমার খুব আপন সম্পর্ক। কিন্তু এদেশের বৃষ্টিটাও বাজে! এরা অতি সন্তর্পণে ঝরবে! কেন রে বাবা! ঝমঝমিয়ে নাম না একবার!! তা নয়, টিপ টিপ করে পড়ছে। যেন একটু বেশি জোরে বৃষ্টি হলেই মাস্টারমশাই খুব বকে দেবে!
কলকাতায় অফিস যাওয়ার সময় খুব চাইতাম একটু মেঘ করুক, সেইসময় আমি অফিস পৌঁছে যাই টুক করে! আর এখানে চাইছি সূর্য উঠুক অন্তত আজকে! অনন্ত অপেক্ষা তবু সূর্য উঠছে না! সেই কবে ভারতবর্ষে সূর্যের মুখ দেখেছিলাম!
গতকাল গোটা বিশ্বে উল্কাপাত হলো, সবাই দেখলো আমি বাদে!
মেঘাচ্ছন্ন মাইন্জ!
আমার দেশের পেঁয়াজের রংটাও কি সুন্দর...কথাতেই আছে পেঁয়াজী রং! ও বাবা! এ দেশের পেঁয়াজ তো সবুজ!!!!
এতো সবুজের বহর দেখলে আমাদের দিদি ভারী খুশি হতো!
কি ভাগ্যিস গাজরের রংও সবুজ নয়!
এখানে আমি লঙ্কা অবধি মিস করছি... কারণ এরা লঙ্কা খায়না!
যদিও আমার মিস করার তালিকাটা বেশ দীর্ঘ!
সূর্য, পেঁয়াজ,চড়ুই, ফুচকা, বাসের কন্ডাক্টারের চীৎকার, অটোর লাইন, লাল পতাকার বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক স্লোগান, কাকের কা কা এমনকি মমতা ব্যানার্জ্জীকেও!!!
এমন হতচ্ছাড়া দেশ, কাক অবধি চীৎকার করে না!
হোয়াই ম্যান? হোয়াই? হোয়াই?
পায়রা আছে অনেক, সেগুলো খেয়ে খেয়ে এত্তো মোটা হয়ে গেছে! তাদের উড়তেও আলিস্যি! এক হাত উঁচু গাছে বাসা করে বসে আছে এবং অবশ্যই নো বক বকম!
মাঝেমধ্যেই প্যানপ্যান করছি এ ক্যামন দেশরে বাবা! সূর্য নেই, কাক নেই, মানুষের চীৎকার নেই! তবে আছে টা কি!!!!!
কদিন আগে ক্রীসমাস পার্টিতে গেলাম। হাই এনার্জী পার্টিকল ডিপার্টমেন্টের পার্টি! তা সেখানে সবাই বিশেষ জ্ঞানী!
চুনোপুঁটি বিজ্ঞানী থেকে আরম্ভ করে হাইফাই বিজ্ঞানী সবরকমই আছেন সেই পার্টিতে!
সেই পার্টি এমন ....কি আর বলবো! লোকে ফিসফিস করে কথা বলছে! যেন হাসপাতালে এসেছি কিংবা সদ্য সদ্য কেউ মারা গেছে! ইনফ্যাক্ট আমাদের দেশে লোক মারা গেলেও এর থেকে বেশি হৈ চৈ হয়! লোকজন চুপচাপ খেলো... তিনচারজন গিটার, পিয়ানো আর ভায়োলিন বাজালো ব্যস!!!
আমি ভাবলাম আমিই উঠে দুটো রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে দিই!
একি রে বাবা! এটা পার্টি!!! কাঁটা চামচ ছুরির টুংটাং আওয়াজ ছাড়া কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না!
সাড়ে আটটায় সকাল হয়ে চারটেই সন্ধ্যে! আমি ঘুম থেকে উঠতে না উঠতে দিন শেষ!
জানালা দিয়ে তাকাবো কি! শুধুই বৃষ্টি! কাঁহাতক আর “শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে” গাওয়া যায়!!!
সবথেকে অসুবিধা হলো কথা বলা! এরা ইংরাজী বোঝে না, বলেও না! এ এক মহা জ্বালা! কথা না বলে বলে পেট ফেঁপে যাচ্ছে!
সূর্য নেই, কাক নেই, চড়ুই নেই...গাড়ির হর্ণ নেই!
নিস্তব্ধ চরাচর... টিপটিপ পা টিপে চলা বৃষ্টির দেশ।

Monday, 7 November 2016

শৈশবের গন্ধ মাখানো শৈশব

আমি বরাবরেই ফাঁকিবাজ ছাত্রী। যাকে বলে সিরিয়াস টাইপ ফাঁকিবাজ। তবে ইস্কুলে পড়াটড়া করে যেতাম, মানে ঐ টুকুই পড়াশোনা করতাম আরকি যেটুকু না হলেই নয়। বাড়িতে আম্মু বাঁদর মেয়ে বলতো আর ইস্কুলে দিদিমণিরা বেশ লক্ষী মেয়ে বলতেন। আমাদের ইস্কুলে দুজন ক্লাস মনিটর থাকতো। তারা অফপিরিয়ডে দায়িত্ব নিয়ে আমাদের চুপ করিয়ে রাখতো যাতে আমাদের মাছের বাজারের কারণে বাকি ক্লাসের ডিসটার্ব না হয়। যারা কথা বলতো তাদের নাম বোর্ডে লেখা হতো আর পরের ক্লাসে দিদিমণি এসে তাদের শাস্তি দিতেন। ক্লাস সেভেনে একবার আমার নাম বোর্ডে উঠে গেছিলো, ভৌতবিজ্ঞানের কবিতা দিদিমণি খুব অবাক হয়ে আমাকে বলেছিলেন তুইও কথা বলেছিস? দুষ্টুমি করেছিস?
এইরকমই রেপুটেশন ছিলো। তবে, আমার জিনিষের ব্যাপারে আমি খুব সতর্ক থাকতাম। প্রতিদিন ইস্কুলে গল্পের বই নিয়ে যেতাম আর কাউকে ছুঁতে দিতাম না বলে অনেকে হিংসুটে বলতো। সে আমি এখনো কাউকে বই দিইনা। বই দিলে সে বই যত্ন না করে ছিঁড়ে ফেললে আমার খুব রাগ হয়। আমি বইখাতা , আমার রং তুলি, আঁকার খাতা, ডাইরী সবই ভীষণ যত্ন করে রাখতে পছন্দ করি।
সেই মেয়েই বাড়িতে বদমাস বলে পরিচিত ছিলো। এমনটা নয় যে আমি জিনিষপত্র ভাঙতাম বা ওলঢোল করতাম, তবু জানি না কেন আম্মু আমাকে হাড় জ্বালানে বলে!!! এই নিয়ে ভারী দুঃখ আমার।
আমি আসলে এতোই বই পড়তাম যে পরীক্ষার কথাও মাথায় থাকতো না। পড়ার বইয়ের ফাঁকে গল্পের বই পড়াতে আমার জুড়ি ছিলো না। পড়তে পড়তে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে এই ত্রিভুবন ত্যাগ করে যেই ক্লাইমেক্সে পৌঁছতাম , অমনি আম্মু কান ধরে বইটা কেড়ে সামনে রসকষহীন পড়ার বই ধরিয়ে দিতো! সমস্যা হলো পড়ার বই পড়তে আমার কোনোদিনই ভালো লাগেনি....!!! যেই ক্লাসটা পেরিয়ে যেতো ঐ ক্লাসের বইগুলো পড়তে ভালো লাগতো। যেমন, ইতিহাস কোনোদিন ভালো লাগতো না, এখন সেই মেয়েই ইতিহাসের বই পড়তে খুব ভালোবাসে!
এই মেয়েই কিন্তু দুবছর বয়সে হাসিখুশি, বর্ণপরিচয় পড়তে শিখে গেছিলো! আমার মেজো পিসেমশাই আমার দিকে তাকিয়ে খুব অবাক হয়ে বলতেন ঐটুকু মেয়ে এতো নির্ভুল পড়ছে কি করে? এতো প্রতিভা দেখে আম্মু আব্বু ভেবে নিলো মেয়ে বড়ো হয়ে কেউকেটা একটা হচ্ছেই!
তারপর একটু বড়ো হতেই আঁকা, আবৃত্তি, কুই্যজে পুরস্কার পাওয়াতে তাঁরা আরো সিওর হয়ে গেলেন!
তারপর যতো বড়ো হলো মেয়ে ততই আশা ভরসা চুরচুর করে বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে পাতি ইঞ্জিনীয়ার হয়ে নঘন্টার অফিসের কেরাণীতে পরিণত হলো সেই প্রতিভাময় কন্যা!
যাইহোক, ছোটোবেলাতে যে জিনিষটা আমি অপছন্দ করতাম সেটা কারোর ক্ষমতা ছিলো না আমার মগজে ঢোকানোর!!
নামতা!!! এতই ফাঁকিবাজ ছিলাম যে আটের ঘরের নামতার বেশি মুখস্ত করিনি! নয়ের ঘরেরটা তো এক থেকে আট মুখস্ত করলেই হয়ে যায়! আর বাকি গুণ করে বসাতাম! আম্মু শত চেষ্টা করেও মুখস্ত করাতে পারেনি! 😂😂
আর একটা জিনিষ আমি অপছন্দ করতাম, তা হলো ইংরাজী! অসহ্য লাগে! এর ফলশ্রুতি আমি ইংরাজীতে বেশ কাঁচা!!! 😂😂😂
আমার পছন্দ কি ছিলো জানো? পুতুলখেলা!
আমার দশ বারোটা পুতুল ছিলো.... এখনো আছে। নীল চোখের চোখ পিটপিট পুতুল। না , বার্বি নয়। ক্লাস টেনের জন্মদিনে আম্মু প্রথম বার্বি উপহার দেয়, সাদা পোষাক পরা খ্রীশ্চান নববধূ। আমার পুতুলের নামও ছিলো.... কেটি, অ্যালিস, হাইডি, রাহুল, এলিস , রাইন ইত্যাদি ।
আমার খেলনা বাটিও ছিলো কত রকমের, প্লাস্টিকের, তামার, স্টিললের , মাটির !!! চামচ সেট, গ্যাস ওভেন, থালা, গ্লাস আরো কতকি। আম্মু কাঠের মিস্ত্রি দিয়ে পুতুলের ড্রেসিং টেবিল, খাট কতকি বানিয়ে দিয়েছিলো। আমি পুতুলের জামা বানাতে ভালোবাসতাম। বর্ধমান শহরের যত নামি দর্জি আছে তাদের কাছে গিয়ে গিয়ে বেঁচে যাওয়া কাপড়ের টুকরো এনে সুন্দর সুন্দর পোষাক বানাতাম। হাতে সেলাই করে। আমার একটা খাতা ছিলো যাতে আমি পোষাক ডিজাইন করতাম। তারপর, সেলাই করে জামা বানাতাম! আমার অনেক ইচ্ছের মধ্যে একটা ইচ্ছে ছিলো ফ্যাশন ডিজাইনার হবো।
তারপর যা হয় আরকি! ছোটোবেলার অগণিত স্বপ্নগুলো স্বপ্ন হয়েই ঘুরে বেড়ায় আমাদের মধ্যে! পৃথিবীতে কিছু ইচ্ছে পূর্ণ না হওয়া বড্ডো দরকার, তবেই না আমরা বেঁচে থাকার রশদ পাবো। এখনো আমার কেটি, অ্যালিসরা আছে, বড়ো একটা সিন্দুকের মধ্যে। আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কালের ক্রমে। আর আমার বুকের ভিতরটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যায় একটু একটু করে। আমার শৈশব লুকিয়ে আছে ঐ পুতুল, গল্পের বই, ছোটোবেলার ছবি আর আম্মুর মুখের গল্পে। আমি অনুভব করি একটু একটু করে, প্রাণ ভরে বাঁচি ঐ সময়টাতে এখনো।
আস্তে আস্তে আমার শৈশবের গন্ধ মাখানো সব জিনিষ নষ্ট হয়ে যাবে, শুধুমাত্র আমি থাকবো.... তারপর আমিও একদিন স্মৃতি হয়ে যাবো। এটাই নিয়ম জগতের.....
আমি শুধু আমার মেয়েকে ঐ নীল চোখ ওলা চোখ পিটপিট পুতুল আর গল্পের বই দিয়ে যাবো একরাশ। যাতে সে আমারি মতো একরাশ স্মৃতি বানিয়ে যেতে পারে নিজের জন্য, অন্যের জন্য।

ডাক্তারবাবু এবং আমি

কদিন ধরেই শরীরটা খারাপ যাচ্ছে। গত সপ্তাহে অফিসে পাঁচ মিনিটের জন্য ধরাধাম ত্যাগ করেছিলাম। সে যাইহোক, ডাক্তারের কাছে গেছি। ডাক্তারবাবু সাংঘাতিক মজার লোক। লাস্টবার যখন গেছিলাম, তখন পোষ্ট ব্রেক আপ সমস্যা চলছিলো। ডাক্তারবাবু আমাকে তাঁর জীবনের ল্যাং খাওয়ার গল্প শুনিয়েছিলেন... যে যাত্রায় ওনার ওষুধ আর ল্যাং খাওয়ার গল্পের সৌজন্যে ট্রমা থেকে বের হয়েছিলাম!!!
এবার, যাওয়ার পরেই উনি জিজ্ঞাসা করলেন সমস্যা কি?
আমি বলার আগেই আমার আম্মু যাবতীয় অভিযোগের ঝুলি নিয়ে বসলেন...
আমি খুব কনফিউজড হয়ে ভাবছিলুম ডাক্তারের কাছে এসেছি নাকি টিচারের কাছে!!!
নেহাৎ ওনার কাছে ডান্ডা ফান্ডা নেই, নইলে আমি সিওর আম্মু ওনাকে রিকুয়েষ্ট করতেন বেশ কয়েক ঘা বসাতে!!
এতো বড়ো ধেড়ে একটি মেয়ের সম্পর্কে যে অ্যাতো অভিযোগ থাকতে পারে, সেটা আমার আম্মুকে না দেখলে বিশ্বাস করা বেশ কঠিন!!
"একদম কথা শোনে না, এতো রাগ মেয়ের ! আপনি কিছু করুন!"
আমি বুঝলাম না আমি কথা শুনি না বা রাগ করি এতে ডাক্তার বাবুর করণীয় কি!!!
বেশ জ্বালায় পরা গেলো তো!
আমি এবার থাকতে না পেরে বলে উঠলাম "আচ্ছা মুসকিল তো!!! তুমি চুপ করবে একটু?
ডাক্তারবাবু আপনিই বলুন এতো বড়ো একটা মেয়ের সব ব্যাপারে নাক গলালে মাথা গরম হবে না? অফিসের ফোন এলেও ওনাকে বলতে হবে কে ফোন করেছে , কি বললো!!!
কিছু বললেই বলবে 'আমি তোর মা, আমার অধিকার সবথেকে বেশি!! আমি জানবো না তো কে জানবে' ! মাথা গরম হওয়াটা কি স্বাভাবিক নয়?"
ডাক্তারবাবু বলে উঠলেন "সত্যিই তো কতো বড়ো হয়ে গেছে! নাক না গলালেই কি নয়?"
আমি ভাবলাম, যাক বাবা আমার হয়েই কথা বলছে!!!
ওমা, সে গুড়ে বালি.... তিনি সংযোজন করলেন " এখনকার জেনারেশনটাই হলো ডিফেক্টিভ, নিজেরাও কাঁদবে অন্যকেও কাঁদাবে!! পুরো জেনারেশনটাই ডিফেক্টিভ জন্ম নিয়েছে।
শোনো মা বাবার কাছে সন্তান কখনো বড়ো হয়না! তুমি যখন মা হবে বুঝতে পারবে!"

বাপ মা হলেই এই বিখ্যাত কথার পেটেন্ট পাওয়া যায় "মা/বাপ হও , তখন বুঝবে!"
বেগতিক দেখে চুপ করে গেলুম। পৃথিবীর সব মা, বাপ একজোট হয়ে যায় সন্তানের বদনাম করার ব্যাপারে! এখন যদি কিছু বলি বলা তো যায় না ইঞ্জেকশন ফুটিয়ে দিলো! আমি আবার ভীষণ ভয় পাই। এদের বিশ্বাস নেই, ছেলেপুলেদের টাইট দেওয়ার ব্যাপারে সব সমান!!
থার্মোমিটারে টেম্পারেচার দেখে , পেট টেপে টুপে, অ্যাঁ করে বের করা জিভ খানিক দেখে শুনে বললেন জ্বর আছে, প্রেশারটাও বেশ লো আছে। সর্দিও আছে.... ভাইরাল মনে হচ্ছে। জল খায়না তাই না?
আমি তো পুরোই কোণঠাসা!!! মোক্ষম জায়গাতে মেরেছে ডাক্তার!!!
এবার আম্মুর চীৎকার আরো বেড়ে গেলো। ডাক্তারবাবু একদম পানি খায়না!! খাবারও খায়না! নইলে এই বয়সে লো প্রেশার হয়?আমি পইপই করে বলেছিলাম পানি না খেলে শরীর খারাপ হবে!!!
ব্যাপার হলো পৃথিবীর সব মায়েরা স্বঘোষিত ডাক্তার হয়! এরা সর্দি, কাশি , বমি সবের ডাক্তারিতে সিদ্ধহস্ত!!!
কি আর করা যাবে, চুপ করেই রইলুম! মনে মনে ভাবছি "হর কুত্তেকা দিন আতা হ্যায়"
যাইহোক, পানি না খেলে স্যালাইন দেওয়ার হুমকি দিয়ে ডাক্তারবাবু পাঁচদিন পরে আবার আমার পদধূলি চেয়েছেন ওনার চেম্বারে!
এই কদিন পানি খেতেই হবে, নইলে ডাক্তারবাবু আর আম্মুর ষড়যন্ত্রে স্যালাইন থেকে কেউ আমাকে বাঁচাতে পারবে না!!!

ভালো আছি, ভালো থেকো।

অফিসে লবিতে দাঁড়ানো মেয়েটির চোখ ছলছল। তার সহকর্মীর সাথে গল্প করছে....তার এক প্রিয় মানুষের মৃত্যুর কথা। রবিবার রাতে অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে...মেয়েটির চোখ থেকে ঝরঝর করে জল পরছে...গলায় আকুতি কেন আমার সাথেই কেন?
আমি বড্ডো স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করলাম। কথাটা শুনে কানে হেড ফোন গুঁজে মুখ ফিরিয়ে চলে এলাম। কিছুই বলার ছিলো না....কি বলতাম? সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কিছুই নেই আমার কাছে.....সমবেদনা আমি জানাতে পারিনা...
প্রিয় মানুষের হারানোর বেদনা বুঝি.... শুধু আমি কেন , এই পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ বোঝে।
যে মানুষটাকে চোখের সামনে হাসতে, খেলতে দেখতো.... সে হঠাৎ করে একদিন নেই.... কোথাও নেই....মন খারাপ করলেও কিছু করার নেই... সে এই পৃথিবীর কোথাও নেই। এই কষ্ট অদ্ভূত রকম কষ্ট।
সেই মানুষটা নেই জীবনে... কিন্তু অন্তত সে এই পৃথিবীতে আছে... হাসছে,খেলছে....ভালো আছে।
হোক না, তার সাথে হয়তো কখনো দেখা হবে না...কোনোদিন ফোনের স্ক্রীণে নং ভেসে উঠবে না...কিন্তু তবু তো মনে শান্তি,বেঁচে আছে, ভালো আছে।
অন্তত পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষগুলোর মতো অন্য জগতে চলে যায়নি সে।
গাড়িটা চলছে তীব্র গতিতে নীল সাদা ফ্লাইওভার পেরিয়ে....সাঁই সাঁই করে পেরিয়ে যাচ্ছে প্রিয় কলকাতা। হেডফোনে গান বাজছে ...জানালা দিয়ে দমকা হাওয়া এসে চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে...কাঁচটা তুলে দিলাম।

পৃথিবীটা বড্ড সুন্দর।
ভালোবাসে বা ঘৃণা করে অথবা কিছুই করে না এমন সব মানুষেরা ভালো থাকুক...এই পৃথিবীরই অন্য কোথাও তারা থাকুক...বেঁচে থাকুক।
সময় বদলায়...মানুষের সম্পর্ক গুলো বদলায়...
একটা সময় পরে বুকের খিঁচখিঁচ অনুভবটা কমে যায়.... অতীত হয়ে স্মৃতিগুলোই রয়ে যায়। একটা সময় পরে ঐ স্মৃতিগুলোর উপরে সময়ের ধূলো জমবে.... ঝাপসা হয়ে যাবে পুরোনো অতীত, নতুন অতীতের কাছে।
একদিন হয়তো হাসি মুখে অতীত বর্তমানের সামনে দাঁড়াবে, সেদিন পুরোনো অতীতের গা থেকে সময়ের ধুলো ঝেড়ে আরো একবার অনুভব করবো পুরোনো সময়টাকে।
ভালো আছি, ভালো থেকো।

ইয়ে সাম যবভি আয়েগি তুম হামকো ইয়াদ আয়োগে...

একটি সপ্তদশী কিশোরী কলকাতা শহরে পা রেখেছিলো... প্রিয় জন্মশহরকে ছাড়তে তার প্রচুর কষ্ট হয়েছিলো... কিছুতেই ভালোবেসে উঠতে পারেনি কলকাতাকে।
নোংরা, ঘিঞ্জি , ভীড়ে ঠাসা কলকাতা তার শহর কখনোই নয়, কোনোদিন সে মনের এক কোণে কলকাতাকে স্থান দেবে না, কিছুতেই নয়।
তারপর নয় বছর কেটে গেছে...গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল...জীবন থেকে চলে গেছে অনেকটা সময়, মনে হয় যেন কত যুগ আগের কথা। পিছনে তাকিয়ে দেখতে পাই কত স্মৃতি জমে গেছে ফেলে আসা জীবনের আনাচে কানাচে।
এই নোংরা শহরটা বড্ড আপন হয়ে গেছে.... পুরোনো রাজপথ, নীল সাদা গ্রীলে ঢাকা ফুটপাত, নিয়ন আলো, ভিখারী সবাই আমার ভীষণ প্রিয়।
এত বছরেও কলকাতাকে সেই ভাবে চিনে উঠতে পারিনি, কেন পারিনি তার পিছনেও রয়েছে অনেক স্মৃতি। তার পরেও মেট্রোর প্রতিটা স্টেশনে, চওড়া রাস্তায় আছে কিছু না কিছু মূহুর্ত লুকিয়ে। যখন সেই স্মৃতি বিজড়িত রাস্তায় নামি তারা এসে মনের ভিতর হাঁকডাক করে...
কলেজ স্ট্রীট আমার কেন এই কলকাতার সব মানুষের প্রিয় একটা জায়গা... কফিহাউস, প্যারামাউন্ট, ট্রামলাইন, অটো সব কিছুই বড়ো প্রিয়।
আমি সবসময়ই চাইতাম কলকাতার সব পুরোনো ইতিহাসকে একবার ছুঁতে, একবার অনুভব করতে। পুরোনো কলকাতার পুরোনো বাড়ির ছাত, জানালা , খড়খড়ি, জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া কড়ি বরগা সবকিছুই আমার অসাধারণ লাগে। মনে হয়, আমার যদি এইরকম পুরোনো বড়ো বারান্দাওলা একটা বাড়ি থাকতো? লম্বা ছাত, যে বাড়ির আনাচে কানাচে যার ইতিহাস লুকোনো... যে বাড়ি সাক্ষী থেকেছে স্বাধীনতা আন্দোলনের, নকশাল আন্দোলনের....যারা সাক্ষী প্রচুর ন্যায়-অন্যায় , বিচার-অবিচারের... ! তাহলে একবার ছুঁয়ে দেখতাম , সেই বাড়ির বারান্দায় বা ছাতে দাঁড়িয়ে চোখ বুজে ভাবতাম সেইসব দিনগুলোর কথা যখন ভোর রাতে কলকাতার রাজপথ ধোয়া হতো....টুনটুন বেল বাজিয়ে ট্রাম যেতো...পুরোনো কলকাতা শহর।
দেবরিনা আর আমি হাঁটছি কলেজ স্ট্রীট ধরে.... ফুটপাত শুনশান রবিবারের ছুটির বাজারে।
কলেজ চত্বর ফাঁকা.... পুঁটিরামের দোকানের বিখ্যাত কচুরি দিয়ে শুরু করলাম , তারপর প্যারামাউন্টের ডাব সরবত, কেশর লস্যি , মৌচাকের রসালো মৌচাক মিষ্টি, কেশর পিস্তা সন্দেশ খেয়ে স্মৃতি বিজড়িত কফিহাউস।
এক কোণের টেবিলের কাছে গিয়ে বসলাম দুজনে... কত রকমের লোকজন ... সবাই আলোচনা করছে কতরকম.... কেউ কাব্য, কেউ কবিতা, রাজনীতি কতকি। পাশের টেবিলে একজন বৃদ্ধ বসে এক মনে কিছু লিখছেন...লিখেই চলেছেন... কে জানে উনি কে... হয়তো কোনো কবি কিংবা লেখক...
খানিক পরে উঠে চলে গেলেন, পরণে পাঞ্জাবি আর ঝোলা ব্যাগ।
হঠাৎ পাশের টেবিলে একজনের ফোনে রিং বেজে উঠলো...
"আজীব দাস্তা হে ইয়ে
কাহা শুরু কাহা খতম...
ইয়ে মঞ্জিলে হ্যায় কৌনসি
না ওহ সমঝ সাকে না হাম...."
স্মৃতি কখনো পিছু ছাড়ে না....। কোনো এক ফেব্রুয়ারি মাসে অষ্টাদশী কোনো এক মেয়ের সাথে কোনো এক মানুষের প্রথম দেখা হয়েছিলো এই কফিহাউসেই....তখনো ফোনে রিংটোন বেজেছিলো "আজীব দাস্তা হ্যায় ইয়ে!"
আমি আর দেবরিনা দুজনেই কফি ঠান্ডা করে খাই। দুজনেই স্মৃতির অতলে... চারপাশে হাজার মানুষ দেখছি, তাদের নিয়ে গল্প করছি... পুরনো স্মৃতির মধ্য থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন মূহুর্ত যারা কিছুক্ষণের মধ্যেই নতুন স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে।
স্মৃতি জন্ম নিতেই থাকে প্রতি মূহুর্তে, আর একটু একটু করে আমরা বড়ো হয়ে উঠি...একটা সময় পরে স্মৃতির ভারে ক্লান্ত হয়ে আমরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিই। সেই স্মৃতিরা ইতিহাস হয়ে রয়ে যায় পুরোনো বাড়ি, রাস্তার আনাচে কানাচে।
হেয়ার স্কুল, হিন্দু স্কুল, সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুল, প্রেসিডেন্সি, মেডিক্যাল কলেজ , কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের প্রতিটা রাস্তায় আমরা হাঁটছি। হাল্কা বাতাস বইছে....ইতিউতি লোকের জটলা... হৈ চৈ...
আকাশে এত্তোবড়ো সোনালী একখানা চাঁদ... নিয়ন আলো আর জ্যোৎস্না মিলে মিশে এক হয়ে গেছে।
আমি হাঁটছি তো হাঁটছিই, ইচ্ছে করছে না মূহুর্তটাকে ছাড়তে..সেই কলকাতাকে ঘৃণা করা মেয়েটা আজকে কলকাতাকে বড়ো ভালোবাসে। কলকাতা তাকে অনেক কিছু দিয়েছে ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, ঘৃণা, শিক্ষা, স্মৃতিতে ভরপুর একটা জীবন দিয়েছে।
গভীর রাত নামছে একটু একটু করে, বাড়ি ফিরতে হবে। পিছনে পড়ে আছে ইতিহাস, স্মৃতি , বহুকাল আগের বড়ো বারান্দায় দাঁড়ানো লাল পাড় সাদা শাড়ী পরা কিশোরী কন্যা....একশো বছর আগের কোনো চাঁদনী রাতের মতোই আজকের রাত... জীবন এগিয়ে চলে ইতিহাস রেখে।
গানটা এখনো কানে বাজছে
"ইয়ে সাম যবভি আয়েগি
তুম হামকো ইয়াদ আয়োগে.....!"